Showing posts with label Anisul Haque. Show all posts
Showing posts with label Anisul Haque. Show all posts

প্রিয় ডিজিটাল চোর...

,
জাপানের ওই অধ্যাপকের হয়ে আমরা একটু ব্যাপারটা কল্পনা করি।
তিনি বাংলা ভাষাপ্রেমিক।
বাংলা শিখেছেন কষ্ট করে। বাংলা সাহিত্য, বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর অপার আগ্রহ।
লালন নিয়ে তিনি গবেষণা করছেন।
গরগর করে বাংলা বলতে পারেন, বাংলা পড়তে পারেন।
সেই বাংলা ও বাঙালিপ্রেমিক জাপানি অধ্যাপক পড়ান জাপানের হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তাঁর কাছে আমন্ত্রণ এসে পৌঁছাল বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা সম্মেলন হবে—বঙ্গবিদ্যা সম্মেলন। তিনি নিশ্চয়ই খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন এই আমন্ত্রণ পেয়ে। তাঁর স্বপ্নের দেশ বাংলাদেশ। তাঁর স্বপ্নের মানুষেরা থাকে ওই দেশে। তারা তাঁর আগ্রহের ভাষা বাংলায় কথা বলে। এই সেই বাংলা, যে বাংলায় লালন জন্মেছিলেন। এই সেই বাংলা, যেই বাংলার পথে পথে এখনো লালনের মতো বাউলেরা একতারা হাতে গান গেয়ে বেড়ান। তিনি অবশ্যই বাংলাদেশে যাবেন।
বঙ্গবিদ্যা সম্মেলনে অংশ নিতে তিনি ঢাকায় আসেন। ১৯ ডিসেম্বর ২০১১। সম্মেলনের ফাঁকে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্রের ক্যাফেটেরিয়ায়। সেখানে তাঁর ব্যাগটা রেখে তিনি খাবার আনতে যান। এসে দেখেন ব্যাগ নেই। নেই নেই তো নেই।
ব্যাগে ছিল দুই হাজার ডলার, এক লক্ষ ইয়েন, পঞ্চাশ হাজার টাকা, ডিজিটাল ক্যামেরা, মডেম, ল্যাপটপ, মূল্যবান কাগজপত্র আর পাসপোর্ট।
সবকিছু খোয়ান তিনি বঙ্গবিদ্যা সম্মেলনে এসে।
পরে তিনি সংবাদপত্রে বিবৃতি পাঠান। তিনি বলেছেন, তিনি টাকা-পয়সা কিছুই চান না। এমনকি ল্যাপটপটাও ফেরত চান না। কিন্তু ওই ল্যাপটপের হার্ডডিস্কে তার মূল্যবান কিছু তথ্য আছে। যেগুলো তিনি সারা জীবন গবেষণা করে সঞ্চয় করেছেন। ওই তথ্যগুলো কারও কিছু কাজে লাগবে না। কিন্তু ওগুলো না পাওয়া মানে তাঁর জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি শুধু ওই তথ্যগুলো ফেরত চান। তিনি কাউকে শাস্তিও দিতে চান না। শুধু তথ্যগুলো ফেরত দেওয়া হোক।
সেটা হয়তো একটা চার শ টাকা দামের পেনড্রাইভে ভরে ফেরত দেওয়া যাবে।
আমরা ওই অধ্যাপকের মনের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করছি।
তাঁর কেমন লাগছে এখন?
বঙ্গবিদ্যা সম্মেলনে এসে তিনি কোন বঙ্গবিদ্যার খবর নিয়ে যাচ্ছেন?
এ ধরনের খবর পড়লে আমাদের মাথা হেঁট হয়ে আসে। আমরা, পুরো জাতিই, লজ্জায় অধোবদন হয়ে পড়ি। জাপান এমন একটা দেশ, যেখানে রাস্তায় কিছু ফেলে রাখলেও কেউ নেয় না। আর এখানে এসে, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্রে তাঁর ব্যাগটা খোয়া গেল?

জাপানের অধ্যাপকটি তবু একজন ব্যক্তিমানুষ। আর যে বা যারা ওই বঙ্গপ্রেমিক মানুষটির ব্যাগটা আত্মসাৎ করেছে, সে বা তারাও ব্যক্তিমানুষ। হয়তো যারা এই অপকর্ম করেছে, তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও নয়। তার পরও আমাদের লজ্জা কমে না। আমরা মুখ দেখানোর কোনো একটা অজুহাতও পাই না। কাজেই আমরা আকুল আবেদন জানাই, ভাই, যার কাছে এই ল্যাপটপটা পৌঁছেছে, তিনি দয়া করুন, এক বা একাধিক পেনড্রাইভে ল্যাপটপের ফাইলগুলো কপি করে ওই জাপানির কাছে পৌঁছানোর একটা উপায় অবলম্বন করুন। পেনড্রাইভের দাম বেশি মনে হলে কুড়ি টাকার সিডিতে ভরেও তথ্য-উপাত্ত ফেরত দেওয়া যেতে পারে।
একটা ছোট্ট পেনড্রাইভে ভরে জাপানি অধ্যাপককে তাঁর গবেষণার ফাইলগুলো ফেরত দিলে হয়তো আমাদের লজ্জা খানিকটা কমবে।
যেমন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ছাত্র হত্যার সঙ্গে জড়িতদের গ্রামবাসী পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে। এমনকি একজনকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন তার বাবা। ওই ঘটনাও খুব লজ্জার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা নৌভ্রমণে বেরুবে, তাদের সঙ্গে মেয়ে, কাজেই ওই মেয়েদের তুলে নিয়ে যেতে হবে—এই চিন্তা মাথায় আসে কী করে, আমাদের ভাবতেই হয়। আর একটা নতুন মোবাইল ফোনের লোভে নৌকার মাঝি মাঝপথে নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ করে ভাসতে লাগল, সেটাও জানার পর আমাদের মনটা খুব দমে যায়। তার পরও যখন গ্রামবাসী তাঁদের গ্রামের ছেলেদের বা একজন বাবা তাঁর নিজের সন্তানকে পুলিশের হাতে তুলে দেন, আমাদের ক্ষতে সামান্য প্রলেপ পড়ে।
তেমনি করে ওই জাপানি ভদ্রলোক যদি তাঁর সারা জীবনের পরিশ্রমের ফসল গবেষণালব্ধ তথ্যগুলো ফেরত পান, আমাদের লজ্জার আগুনে হয়তো সামান্য পানি পড়বে।
কিন্তু ভাবছি, যখন বিশ্বব্যাংক আমাদের মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করে, আর ওই মন্ত্রীকে কেবল বদলি করা হয়, আর ওই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সরকারের উচ্চতম অবস্থান থেকে সাফাই গাওয়া হয়, তখন আমাদের লজ্জার আগুনে তো পানি পড়ে না, বরং কেরোসিন পড়ে।
একটা পেনড্রাইভে করে জাপানি গবেষকের তথ্য তাঁর কাছে ফেরত দেওয়া গেলে আমাদের লজ্জা খানিকটা কমে। কিন্তু আমাদের জাতীয় লজ্জা কোন পেনড্রাইভে ভরে আমরা জমা দেব?
জাপানি ওই অধ্যাপকের কাছে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলি, আপনি যদি বাংলাদেশের প্রবাদ-প্রবচন বাগ্ধারাগুলো নিয়ে গবেষণা করেন, তাহলে আপনি বঙ্গবিদ্যা সম্পর্কে বহু কিছু জানতেন।
এই দেশের বাগ্ধারা হলো, চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা যদি না পড়ে ধরা। এই দেশের বাগ্ধারা হলো, চোরের মার বড় গলা। আপনি নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথের লেখার ভীষণ ভক্ত। তিনি বলেছেন, ‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।’ আর আপনার আগ্রহের অন্যতম বিষয় যে লালন তিনি বলেছেন, ‘মন সহজে কি সই হবা, চিরদিন ইচ্ছা মনে আল ডিঙায়ে ঘাস খাবা।’ এই দেশের প্রবাদ হলো, ‘চোরের দশ দিন, সাধুর এক দিন।’
আমরা কেবল চোরের দশ দিন দেখে যাচ্ছি, সাধুর এক দিন এই দেশে আসছে না। এই দেশের বাগ্ধারা হলো, ‘পুকুরচুরি’। এই দেশে কেবল পুকুরচুরি হয় না; সমুদ্রচুরি, সেতুচুরি, নদীচুরিও হয়।
তবে আশার কথা হলো, আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলছি। আপনার চুরিটাকে আমরা বলতে পারি, ডিজিটাল চুরি। আপনার ওই ডিজিটাল চোরের প্রতি আমাদের আকুল আবেদন, হে ডিজিটাল চোর, তুমি সব চুরি করো, কিন্তু বাংলাদেশের মান-সম্মান ভাবমূর্তি চুরি কোরো না। দয়া করে তুমি জাপানি ভদ্রলোকের মূল্যবান গবেষণা তথ্য ফেরত দাও।
একই কথা হয়তো আমাদের সেতু বা নদীবিষয়ক ভাবমূর্তি অপহারকদেরও বলতে পারতাম। কিন্তু ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী।’

Partner site : online news / celebrities /  celebrity image
website design by Web School.
Read more

মাননীয় হুকুমদাতা, আপনাকে বলছি...

,
ইশ, সকালবেলা উঠে এ কী দৃশ্য দেখতে হলো প্রথম আলোর প্রথম পাতায়! দাউ দাউ করে পুড়ছে একটা বাস, দোজখের আগুনের মতো, ‘সিলেট-হবিগঞ্জ সুপার এক্সপ্রেস’ লেখাটা স্পষ্ট আর সৌকর্যময়। জানালা দিয়ে বেরিয়ে আছে একজোড়া পা, মানুষের দুটো পা, জুতো পরা। পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে ওই মানুষটা। সকালবেলা তিনি বের হয়েছিলেন জুতামোজা পরে; নাশতা করেছিলেন, প্রিয়জনের কাছে বিদায় নিয়েছিলেন, কাজে যাচ্ছিলেন কিংবা যাচ্ছিলেন আপন ঠিকানাতেই। তাঁরও জনক-জননী আছে, তাঁরও জন্মের সময় মুখে মধু বা কানে আজান দেওয়া হয়েছিল। ওই মানুষটিও স্কুলে গেছেন, লেখাপড়া শিখেছেন; তাঁরও আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব আছে, তিনিও ভোট দিতে ভোটকেন্দ্রে গেছেন। একটা মানুষ। একটা জলজ্যান্ত মানুষ। বিবাহিত হলে তাঁর স্ত্রী-সন্তান আছে, হয়তো। তাঁর কী অপরাধ? কেন তাঁকে জ্বলন্ত বাসের মধ্যে কাবাবের মতো পুড়তে হলো?
এ কোন রাজনীতি? এ কোন মানবিকতা? এ কোন আদর্শ? রাজনীতি মানে না নীতির রাজা? নিরপরাধ মানুষকে পুড়িয়ে মারার নাম নীতির রাজা? মানুষ মেরে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা?
১৮ ডিসেম্বর ২০১১ ঢাকাসহ সারা দেশে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো কী ঘটতে দেখলাম আমরা! সারা দেশে একযোগে বাসে আগুন, গাড়িতে আগুন, বাস ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ। ককটেল বিস্ফোরণে ঢাকার মতিঝিলে মারাও গেছেন এক তরুণ।
এ তো স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ নয়। রাস্তায় আন্দোলন আমরাও করেছি, নব্বইয়ের দশকের উত্তাল গণ-আন্দোলনের দিনগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে পুলিশের সঙ্গে ঢিল ছোড়াছুড়ির অভিজ্ঞতা আমাদেরও কিছু আছে। বিএনপির মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা ছিল ওই দিন, তাতে আসার পথে পুলিশ বাধা দিয়েছে। তাতেই একযোগে সারা দেশে এতগুলো ককটেল সকালবেলাতেই ফুটতে পারে না, এতগুলো বাসে আগুন জ্বলে উঠতে পারে না, যদি না আগে থেকেই পরিকল্পনা করা হয়ে থাকে, প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে থাকে। একটা ঠান্ডা মাথার পূর্বপরিকল্পনার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আগে থেকেই নির্দেশ দিতে হয়েছে, ককটেল বানাও। গাড়ি পোড়ানোর সিদ্ধান্তটাও কাউকে না কাউকে নিতে হয়েছে এবং সেটা সারা দেশের কর্মীদের জানিয়ে দিতে হয়েছে।
জনাব পরিকল্পনাকারী ও হুকুমদাতা, অভিনন্দন! আপনার পরিকল্পনা আমাদের কল্পনাকেও হার মানিয়েছে। আজ আপনি যখন নাশতা করছেন, প্রথম আলোর ১৯ ডিসেম্বর ২০১১-এর কাগজটা হাতে নিন। ওই যে মানুষটা বাসের জানালা দিয়ে পা বের করে দিয়ে ভেতরে দাউ দাউ আগুনে পুড়ে যাচ্ছেন, যাঁর মাংসের পোড়া গন্ধে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের চণ্ডীপুলে বদিকোনার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে আছে, তাঁর মৃত্যুর গন্ধ, পোড়া মাংসের গন্ধে আপনার আজকের ব্রেকফাস্ট কি আরও জমে উঠল?
পত্রিকায় নানা কথাই লেখা হয়েছে। বলা হচ্ছে, বিএনপি-জামায়াতের পরিকল্পনা ছিল মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনার নাম করে সারা দেশ থেকে লক্ষ মানুষকে ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে জড়ো করে সেখান থেকে সচিবালয়ের দিকে যাত্রা করে রাজধানী অচল করে দেওয়া। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগেই সেটা টের পেয়ে গিয়ে তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা সমাবেশে প্রবেশে বাধার প্রতিক্রিয়া ককটেল-বোমার গণবিস্ফোরণ নয়, হতে পারে না। যাত্রীভরা চলন্ত বাসে আগুন দেওয়াটাকেও গণ-আন্দোলন বলে না।
একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেল চ্যানেল আইয়ের সংবাদ থেকে। ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, গোলাম আযমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ হলো তারই প্রতিক্রিয়া। গোলাম আযমের কথিত গ্রেপ্তারের প্রতিক্রিয়া দেখাতে এত বিপুলসংখ্যক গাড়ি ভাঙচুর, গাড়িতে আগুন আর বোমা ফাটানোর মহড়া!
হরতালের আগের দিন গাড়িতে আগুন একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এখন হরতালের দিনে গাড়ি চলে নিরাপদে, কিন্তু হরতালের আগের সন্ধ্যায় গাড়ি পাওয়া যায় না, রাজধানীর রাজপথে অফিসফেরত মানুষ ভোগান্তির শিকার হয় চরম। আর এইভাবে গাড়ি পোড়াতে গিয়ে, গাড়িতে গানপাউডার ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে মানুষ মারা হয়েছে অতীতে, এই শহরেই। বেবিট্যাক্সিতে আগুন দিয়ে এর চালককে জীবন্ত কয়লা বানানো হয়েছে একাধিকবার। পুরো শরীরের দগদগে ক্ষত নিয়ে বেবিট্যাক্সিচালক কয়েক দিন অকল্পনীয় যন্ত্রণায় ছটফট করেছেন হাসপাতালে, তারপর একসময় ঢলে পড়েছেন মৃত্যুর কোলে—এই সব খবর আমরা ভুলতে পারি না। হরতালের আগে যাত্রীবাহী বাসে আগুন দিতে হবে, এটা কোন ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি? এ তো স্রেফ বর্বরতা। যাত্রী কিংবা চালকসমেত বেবিট্যাক্সিতে আগুন দিতে হবে—জ্বলন্ত শরীর নিয়ে কাতরাবে, গড়াগড়ি খাবে মানুষ; এই দৃশ্য দেখার মধ্যে কোন রাজনৈতিক পরিতৃপ্তি, কোন তৃপ্তির ঢেকুর?
ছোট্ট কন্যাটি অপেক্ষা করে বাড়িতে, বাবা আসবেন। বাবা আসেন না। মা সারা রাত জেগে থাকেন দরজা ধরে, পথ চেয়ে—এই বুঝি ছেলে ফিরে এল। ছেলে ফিরবে কী, সে তো একটা পোড়া মাংসের অবয়বহীন দলা হয়ে পড়ে আছে কোনো ভস্মীভূত গাড়ির ভেতরে।
আমাদের রাজনীতিবিদদের, আমাদের নেতাদের বুঝতে হবে, প্রতিটা জীবন মূল্যবান। অধিকার জনগণের হয় না, অধিকার হয় প্রত্যেক মানুষের। নিরাপত্তা সারা দেশের মানুষের হয় না, নিরাপত্তা হয় প্রত্যেক মানুষের আলাদা আলাদা। একটা মানুষকে হত্যা করা মানে মানবতাকেই হত্যা করা। একজন নাগরিককে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মারা মানে মানবসত্যকেই জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মারা।
আগে থেকে ঘোষণা না দিয়ে হঠাৎ করে আপনি গাড়ি ভাঙতে, আগুন জ্বালাতে, ককটেল ফোটাতে কেন যাবেন? গত পরশু ঢাকা শহরে মানুষের কী ভোগান্তিটাই না হয়েছে। একদিকে যানজট, অন্যদিকে আতঙ্ক। কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে বিপদে পড়েছে মানুষ, কাজ থেকে ফেরার পথে যানবাহন পাওয়া হয়ে পড়েছে ভার। মানুষের এই সব দুঃখ-কষ্টের কোনোই মূল্য নেই আমাদের রাজনীতিবিদদের কাছে? কিসের জন্য রাজনীতি করেন আপনারা? শুধু ক্ষমতার মধু পান করার জন্য, শুধু কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার জন্য, শুধু বিরোধী মতকে দলন করার জন্য?
আর সারা দেশে একযোগে বোমা ফাটানোর মানে কী? এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় জেএমবির সিরিজ বোমা বিস্ফোরণের দিনগুলোর কথা। আমাদের ভয় হয়, বড় নেতাদের জেলখানায় ঢুকতে দেখে জামায়াত তার মরণকামড় দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা সারা দেশকেই জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়ার কর্মসূচির একটা মহড়া করল মাত্র। আর পরিহাসটা দেখুন। কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেওয়ার আর মাঠে ককটেল হাতে নেমে পড়েছে স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিটি।
যে পরিকল্পনাকারীরা এই ককটেল বানানোর ও ফাটানোর পরিকল্পনা করেছে, নির্দেশ দিয়েছে, তাদের নাকে কি মাংসপোড়া গন্ধ যাচ্ছে না? আরবের সব সুগন্ধীও কি তাদের হাতে রক্তের গন্ধ দূর করতে পারবে?
হয়তো এদের কোনো ঘ্রাণেন্দ্রিয় নেই। ক্ষমতার মোহ এদের নাক-কান-চোখ বন্ধ করে দিয়েছে। এদের বিবেক বহু আগেই মারা গেছে। সাধারণ দয়া-মায়া-করুণা নামের মানবিক গুণগুলো এদের সত্তা থেকে বহু আগেই বিতাড়িত। এরা অন্ধ, এরা ক্ষমতান্ধ, এরা অন্ধ, এরা আদর্শ-অন্ধ।
এরা করতে পারে না, এমন কোনো কাজ নেই।
হে আল্লাহ, এই রকম রাজনীতি-অন্ধ, ক্ষমতা-অন্ধ, আদর্শ-অন্ধ ভয়ংকর রাজনীতিকদের হাত থেকে দেশ ও মানুষকে তুমি রক্ষা করো।

Partner site : online news / celebrities /  celebrity image
website design by Web School.
Read more

বচনামৃত ও ফরেন হেল্প

,
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, টাকা থাকলে তিনি ঢাকাকে চার টুকরা করতেন। ঢাকা মানে ঠিক ঢাকাকে নয়, ঢাকা সিটি করপোরেশনকে। নাগরিক সুবিধা জনগণের দোরগোড়ায় তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সাহসী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ।
এই ধরনের একটি বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী দেশরত্নকে অভিনন্দন জানিয়ে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় ব্যানার ও পোস্টার লাগানো হয়েছে। দুটো ব্যানার/পোস্টার আমার চোখে পড়েছে। ব্যানারটা ঝোলানো হয়েছে ঢাকার একজন সাংসদ শেখ ফজলে নূর তাপসের পক্ষ থেকে, পোস্টারটা প্রকাশ করেছেন ঢাকার আরেক সাবেক সাংসদ হাজি সেলিম। এই পোস্টার ও ব্যানার দেখে মনে হচ্ছে, টাকার কোনো অভাব নেই। শেখ হাসিনা অবশ্য নিজেও বলেছেন, টাকার কোনো অভাব তার সরকারের নেই।
তেলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করতে গিয়ে প্রচুর জ্বালানি তেল আমদানি করতে হচ্ছে, তাই টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশে। ফলে সরকারের হাতে টাকা নেই, এই সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশে টাকার কোনো অভাব নেই। এই তো কিছুদিন আগে মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো লাইসেন্স নবায়ন ফি বাবদ সরকারকে তিন হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। আরও টাকা আসছে।
যেহেতু টাকার কোনো অভাব নেই এবং আরও টাকা আসছে, আর যেহেতু, ঢাকা সিটি করপোরেশনকে ভাগ করা হচ্ছে নাগরিক সুবিধা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য, সুতরাং ঢাকাকে মানে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে চার টুকরা করার ভাবনাটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন বাস্তবায়ন করেই ফেলতে পারেন।
এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই বলেছেন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে যারা সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রয়াসের সমালোচনা করেন, তাঁদের বাড়িতে বিদ্যুতের লাইন দুদিনের জন্য হলেও কেটে দেওয়া উচিত। তাহলেই তাঁরা বুঝবেন, বিদ্যুৎ কত জরুরি। আর টিভি টকশোতে বসে কথা বলা সোজা, কিন্তু বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। বিদ্যুৎ না থাকলে বলবেন বিদ্যুৎ কেন নেই, আবার বিদ্যুৎ পেলে এসি ঘরে বসে সমালোচনা করবেন, টাকা কেন খরচা হয়ে যাচ্ছে, তা তো হবে না।
বিএনপি-জামায়াত জোট রোড মার্চের নামে রোড শো করছে। এসব গাড়ি কীভাবে কেনা হলো, তা জনগণ জানতে চায়। ভাষাকন্যার কণ্ঠেই জনগণের সেই চাওয়া ভাষা পেয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘বিরোধীদলীয় নেত্রী ক্ষমতায় থাকতে দুর্নীতির মাধ্যমে কত টাকা কামিয়েছেন তা প্রমাণিত হয় ওই রোড মার্চের গাড়িগুলো দেখলে। প্রত্যেকটা গাড়ির নম্বর নিয়েছি, কারা কীভাবে গাড়ি কিনেছে, সব আমরা দেখব।’
তিনি যথার্থই বলেছেন, ‘বিএনপি আমলের দুর্নীতির কারণেই বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন স্থগিত করেছে। বিএনপি আমলের যোগাযোগ মন্ত্রীর দুর্নীতির দুটো ডকুমেন্ট বিশ্বব্যাংকের কাছে গেছে। তারপরই তারা অর্থায়ন স্থগিত করেছে। ’
এটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন অক্টোবর মাসে, লালমনির হাটের জনসভায়। ডিসেম্বরে এসে তিনি বলেছেন, পদ্মা সেতুতে এখনো টাকা বরাদ্দ হয়নি। দুর্নীতি হলো কীভাবে? কাজেই পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়েছে, এটা বিশ্বব্যাংককেই প্রমাণ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচিত বিএনপিকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়নি, এটা বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে। তা না হলে দেশের দুর্নাম হয়ে যাচ্ছে। (কারণ দুর্নীতি হয়ে থাকলে বিএনপির আমলে হয়েছে, আবুল হোসেনের আমলে নয়)
তো বিশ্বব্যাংক যদি টাকা না দেয়, না দেবে। সরকারের টাকার অভাব নেই। দরকার হলে আমরা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির ভিত্তিতে পদ্মা সেতু বানাব। শুধু একটা বানাব না, দুইটা বানাব।
এই কথা যখন আমাদের প্রধানমন্ত্রী উচ্চারণ করেন, গর্বে আমাদের মাথা উঁচু হয়ে ওঠে। কিন্তু এখানেও তথাকথিত টকশো-জীবীরা নানা কথা বলাবলি শুরু করেছেন। তাঁদের মতে, বিশ্বব্যাংকের ঋণ নাকি খুব কম সুদে পাওয়া যায়, আর বেসরকারি উদ্যোক্তার কাছ থেকে সেতু নির্মাণে বিনিয়োগ আনা হলে তারা দাম নেবে বেশি, পরে আমাদের সেতুর সারচার্জ গুনতে হবে চড়া। যাঁরা এসি রুমে বসে এই ধরনের কথা বলছেন, তাঁদের বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া হোক। শুধু তাই নয়, তাঁদেরও গাড়ির নম্বর টুকে রাখা হোক, ভবিষ্যতে যখন দুটো পদ্মা সেতু হবে, সেই সেতুতে এই গাড়িগুলো উঠতে দেওয়া হবে না।
হুমায়ূন আহমেদ প্রেরিত কৌতুকের বই থেকে
আমার অফিসের টেবিলে দেখি একটা কাগজের প্যাকেট। প্যাকেটটা খুললাম। দেখি একটা ইংরেজি বই। কৌতুকের বই। বইটা কে পাঠাল, কেন পাঠাল, ভাবছি। তারপর দেখি লেখা:
আনিসুল হক,
তোমার রসিকতাগুলো পানসে হয়ে যাচ্ছে। ফরেন হেল্প নাও।
হুমায়ূন আহমেদ
২৯ নভেম্বর ২০১১, জ্যামাইকা, নিউইয়র্ক।
সর্বনাশ, আমার লেখা যে পানসে হয়ে যাচ্ছে, নিউইয়র্কে বসে হুমায়ূন আহমেদ স্যারও সেটা টের পাচ্ছেন। সত্যি সত্যি আমার ফরেন হেল্প দরকার।
হুমায়ূন স্যারের পাঠানো ৬০০ নতুন কৌতুকের বইটা ঢুঁড়ছি। নাহ, বেশির ভাগ কৌতুকই প্রাপ্তবয়স্কের জন্য। গদ্যকার্টুনের অনেক পাঠক আছে, যারা প্রাপ্তবয়স্ক নয়।
আচ্ছা, পাওয়া গেছে। সারা পলিনকে নিয়ে কৌতুক। সারা পলিন এবার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করুন, এই বিষয়ে ব্যাপক সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে।
সকালবেলা এ রকম একটা কথা শুনে সারা পলিন তাঁর এক সহযোগীকে বললেন, ‘এটা কি সত্য অনেকে বলছে, আমার আবার নির্বাচনে দাঁড়ানো উচিত, এবং এবার প্রেসিডেন্ট পদে?’
‘জি, অনেকেই তা বলছে।’
‘তা তারা বলছে পার্টি ফোরামে?’
‘জি, তা তারা বলছে পার্টি ফোরামে।’
‘এবং তারা সবাই রিপাবলিকান?’
সহযোগী তখন মাথা চুলকে বলল, ‘না, তারা রিপাবলিকান নয়। তারা সবাই ডেমোক্র্যাট।’
সারা পলিনের মতো দেখতে একজন মহিলা একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকেছেন। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ভীষণ ভিড় জমে গেল। তবে এই জনতা শিগগিরই বুঝতে পারল, এই মহিলা সারা পলিন নন।
কীভাবে?
কীভাবে? জনতা আশ্চর্য হয়ে দেখল, তাদের উত্থাপিত প্রশ্নের সঠিক উত্তর এই মহিলা দিয়ে দিচ্ছেন।
মানে কী? মানে বুঝতে হলে বুশ সাহেবের পুরোনো কৌতুক দিয়ে চালাতে হবে।
বুশ সাহেব গেছেন স্বর্গের দরজায়। প্রহরী তাকে আটকে দিল। বলল, ‘জনাব, আপনার পরিচয়পত্র দেখান।’
বুশ বললেন, ‘আমি বুশ, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলাম। অবশ্যই আমি স্বর্গে যাওয়ার যোগ্যতা রাখি। আমার আবার পরিচয়পত্র কী?’
প্রহরী বলল, ‘আপনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। অবশ্যই আপনি স্বর্গে যাবেন। তবে এখানকার নিয়ম হলো, পরিচয়পত্র দেখিয়ে তারপর ঢুকতে হয়। যেমন ধরুন, একটু আগে পাবলো পিকাসো এসেছিলেন। আমরা তাঁকে বললাম, আপনিই যে পিকাসো, তার প্রমাণ কী। উনি ওনার বিখ্যাত শান্তির পায়রার ছবিটা একটানে এঁকে দিয়ে স্বাক্ষর করে দিলেন। তাঁকে আমরা ঢুকতে দিলাম। তারপর এলেন আইনস্টাইন। তাকে বলা হলো নিজের পরিচয়ের প্রমাণ দিতে। এই দেখুন তিনি লিখে দিয়েছেন ই ইজ ইকুয়াল টু এম সি-স্কয়ার। তারপর তিনি সাইন করেছেন। আমরা তাকে ঢুকতে দিয়েছি। আপনিও একটা কিছু করে দেখান।’
বুশ বললেন, ‘পাবলো পিকাসো, আইনস্টাইন, এরা আবার কারা?’
প্রহরী বলল, ‘বুঝেছি, বুঝেছি, আপনিই বুশ। আপনি প্রবেশ করুন।’

Partner site : online news / celebrities /  celebrity image
website design by Web School.
Read more

মা-মেয়ের সংগ্রাম কি শেষ হবে না?

,
কবি রুবি রহমানের সঙ্গে বহু দিন দেখা করার সাহস করে উঠতে পারিনি। তাঁর মুখোমুখি হওয়ার সাহস আমার ছিল না। তাঁর সঙ্গে যদি দেখা হয়েই যায়, তাঁকে কী বলব, তা আমি জানতাম না।
ঘটনার তিন বছর পেরিয়ে গেল। গত ৩ আর ৪ ডিসেম্বর ছিল রুবি আপার সন্তান ও স্বামীর মৃত্যুর তৃতীয় বার্ষিকী।
রুবি আপার ছিল সুখের সংসার। তাঁর স্বামী দেখতে ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের মতো। শ্রমিকনেতা নূরুল ইসলাম। সদালাপী বিনয়ী এই ভদ্রলোককে মনে হতো অজাতশত্রু। কবি রুবি রহমান মানেই যেন স্নিগ্ধতা। তাঁর চলাফেরা, কথাবার্তায় বৃষ্টিধোয়া কাঁঠালচাঁপা ফুলের শান্ত স্নিগ্ধতা। তাঁর মতোই তাঁর কবিতাও খুব পরিমিত, সুরুচি-সুন্দর। তাঁকে দেখে আসছি সেই ১৯৮৭ সাল থেকে, জাতীয় কবিতা উৎসব উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে কবি রুবি রহমান আসতেন। সঙ্গে আসত তাঁর কিশোরী মেয়েটি—মৌটুসী ইসলাম।
রুবি রহমানের সঙ্গে আমার একটা বিশেষ হূদ্যতা আছে। দেখা হলেই আমাদের দুজনের মধ্যে একটা বার্তা বিনিময় ঘটে যেত। রুবি রহমান আমার কাছে কবিতা চাইতেন। তিনি কালি ও কলম-এর সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দেওয়ার পরও আমার কাছে গদ্য চাননি, কবিতাই চেয়েছেন। তিনি আমাকে বলতেন, ‘আনিস, আমি কিন্তু তোমার কাছে কবিতাই চাইব। গদ্য আমি তোমার কাছে চাই না।’
আমি খুব খুশি হতাম।
রুবি আপার কাছ থেকেও আমি আশা করতাম কবিতার অপূর্ব পঙিক্তমালাই।
এক ছেলে তমোহর, এক মেয়ে মৌটুসী, কবি রুবি রহমান আর শ্রমিকনেতা গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি নূরুল ইসলাম; তাঁদের ছিল সোনার ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখা ছবির মতো সংসার।
রুবি আপা ২০০৮ সালে গেলেন আমেরিকার আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে, আন্তর্জাতিক লেখকদের আবাসিক কর্মসূচিতে। আপনারা যাঁরা আমার লেখা নিয়মিত পড়েন, তাঁরা জানেন, ২০১০ সালে একই কর্মসূচিতে বাংলাদেশ থেকে আমিও গিয়েছিলাম। ওখানে কী কী করেছি, তার কিছু কিছু বর্ণনা আপনারা প্রথম আলোর এই কলামেই গত বছর পড়েওছেন। রুবি রহমানও আনন্দের সঙ্গেই গিয়েছিলেন আমেরিকায়। ৩ মাসের কর্মসূচি তখন শেষ। তিনি এসেছেন ওয়াশিংটন ডিসিতে। তাঁর মেয়ে মৌটুসীর বাসায়। মৌটুসী কাজ করেন একটা বিশ্বসংস্থায়। ঢাকায় রুবি আপার ছেলে ৩৮ বছরের তমোহর আছে। আছেন নূরুল ইসলাম। প্রোগ্রাম শেষ। মেয়ের বাসায় কয়েক দিন থেকেই ঢাকা ফিরে আসবেন রুবি রহমান।
ঢাকায় সে সময় চলছে নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়ে উত্তেজনা। সামনে নির্বাচন। নূরুল ইসলাম প্রার্থী হবেন মহাজোট থেকে, সেই রকমেরই প্রস্তুতি চলছে।
ঠিক এই সময় ঢাকায় ঘটে যায় সেই হূদয়বিদারক ঘটনা। ৩ ডিসেম্বর রাতে লালমাটিয়ার ফ্ল্যাটে কী একটা রহস্যময় বিস্ফোরণ ঘটে, তাতে সে রাতেই মারা যান তমোহর, পরের দিন মৃত্যুবরণ করেন নূরুল ইসলাম।
কীভাবে খবর পেলেন কবি রুবি রহমান?
কীভাবে তিনি ছুটে এলেন ঢাকায় এটা দেখতে যে তাঁর ছেলে ও স্বামী আর নেই?
কীভাবে এসেছিলেন মৌটুসী, যিনি তাঁর বাবা ও ভাইকে আর কোনো দিনও দেখবেন না।
রুবি রহমানের সামনে এরপর থেকে দাঁড়াতে পারি না। তাঁর চোখের দিকে তাকাতে পারি না। তাঁকে একটা সান্ত্বনার বাক্যও আমি বলতে পারিনি। স্বামী আর পুত্রকে রেখে আমেরিকায় গিয়ে ফিরে এসে যিনি দেখেছেন তাঁদের মৃতদেহ, সেই মানুষটাকে কীভাবে সমবেদনা জানাতে হয় আমি জানি না।
এই পরিবারটি এবং তার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের সচেতন মানুষ, সেই দিন থেকে নূরুল ইসলাম ও ইসলাম তমোহর নিহত হওয়ার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়ে আসছে। গত পরশু, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০১১, তাঁদের মৃত্যুর তৃতীয় বার্ষিকীতেও দুটো কর্মসূচি পালিত হয়েছে। দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় মৌন মানববন্ধন হয়েছে। সেখানে মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ অনেকেই দাঁড়িয়েছিলেন হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে প্রকাশিত পোস্টার শরীরে সেঁটে। মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘বিজয়ের মাস এলে মানুষ আনন্দ বোধ করে। কিন্তু তিন বছর ধরে ডিসেম্বরে আর আনন্দ করতে পারছি না। যাঁরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন, যাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, তাঁদেরই একজনকে হত্যা করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, কয়েক দিন আগে নূরুল ইসলামকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। আমরা জানতে চাই, কারা হুমকি দিয়েছিল।’
শনিবারেই বিকেল বেলা নূরুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে গঠিত নাগরিক কমিটি আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন। বক্তব্য দেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, আওয়ামী লীগের নেতা তোফায়েল আহমেদ, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, আওয়ামী লীগের নেতা নুহ-উল আলম লেনিন, পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান, কবি মহাদেব সাহা। সভা সঞ্চালন করেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে উপস্থিত ছিলেন, মতিয়া চৌধুরীর মতো জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ছিলেন। এর আগে, সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও নূরুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে আয়োজিত কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন। রুবি রহমান নিজেই এখন আওয়ামী লীগের সাংসদ।
এরপরও মৌটুসী তাঁর ভাই হত্যা, পিতৃহত্যার দাবিতে সংগ্রাম করতে করতে যেন জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছেন। রুবি রহমান যেন ভেঙে পড়ছেন।
রুবি রহমান আর মৌটুসী এই মা-মেয়েকে যেন উজানস্রোতে নৌকা বাইতে হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডও ধামাচাপা পড়ে যাবে। এই দুই নারী কোনো দিনও তাঁদের স্বজন হত্যার বিচার পাবেন না।
এই আশঙ্কার কারণ আছে। কারণ, যাকে তাঁরা বলছেন হত্যাকাণ্ড, কেউ কেউ তাকে একটা হঠাৎ ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দিতে চান। প্রচার করা হয়েছে, ফ্রিজ বিস্ফোরণে এই ঘটনা ঘটেছে।
অথচ ফ্রিজের গ্যাস সিলিন্ডার অক্ষত আছে। ফিজের সঙ্গে বিদ্যুতের কোনো সংযোগ ছিলই না।
বলা হয়েছে, শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। অথচ শর্টসার্কিটের কোনো চিহ্নই নেই ওই গৃহে।
তাঁরা বলছেন, ওই দিন তাঁদের বাসগৃহের প্রবেশদ্বারের চাবি বাঁকানো ছিল। কে বাঁকিয়েছিল?
গ্রিলও বাঁকানো ছিল।
মৌটুসী এর আগে প্রকাশিত তাঁর লেখায় এসব প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানতে চান, কেই বা ২ ডিসেম্বর ২০০৮-এ নোয়াখালী সফররত নূরুল ইসলামকে ফোন করে ঋণখেলাপি হিসেবে তাঁর নাম উঠেছে বলে তাঁকে ডেকে ঢাকায় এনেছিল?
এসব প্রশ্ন নিয়ে মৌটুসী একবার সংবাদমাধ্যমের অফিসে, একবার মন্ত্রী-নেতাদের বাড়িতে কিংবা দপ্তরে, একবার পুলিশের উচ্চকর্তাদের দ্বারে হন্যে হয়ে ঘুরছেন।
কথার মালা গাঁথা হচ্ছে, কিন্তু তদন্ত ঠিক পথটা খুঁজে পায় না। এই মামলা ‘চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে’ গণ্য করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল বিশেষভাবে এই মামলা পর্যবেক্ষণে রেখেছে। তবু তদন্ত এগোয় না কেন?
তখনই ভয়ে আমাদের শরীর হিম হয়ে আসে। আওয়ামী লীগের এমপি তাঁর স্বামী ও সন্তান হত্যার বিচার পান না! মহাজোটের সম্ভাব্য প্রার্থীকে মেরে ফেলা হলো, সেই মহাজোট বিপুল ভোটে জিতে ক্ষমতায় এল, তারপরও সেই হত্যারহস্যের কিনারা হয় না। স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেই নিহতের স্মরণসভায় উপস্থিত থাকেন, সেই নিহত তাঁর মৃত্যুর বিচার পান না?
রুবি রহমানের মুখের দিকে তাকানোর সাহস তাই আমরা হারিয়ে ফেলি। তাঁর মেয়ে মৌটুসী যখন বিচারের দাবিতে জনমত সংগঠনের জন্য প্রাণান্তকর পরিশ্রম করেন, আমরা তাঁকে সমর্থন দিই, কিন্তু আশ্বাস দিতে পারি না।
এবার বোধহয় সময় এসেছে সত্যিকারের একটা পরিবর্তন আনার। অর্থবহ কিছু একটা করার। শ্রমিকনেতা নূরুল ইসলাম হত্যা মামলাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার। আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে এই ‘হত্যাকাণ্ডের’ সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা যাবে না, আমাদের তা মনে হয় না। মৌটুসী ইসলাম ও অন্যরা যে প্রশ্নগুলো তুলছেন, সেসবের উত্তর তো আমাদের পেতে হবে। সেসব প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব পাওয়ার পরে যদি একটা সিদ্ধান্তে আসা যায়, সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে নিশ্চয়ই কারো আপত্তি থাকবে না।

Partner site : online news / celebrities /  celebrity image
website design by Web School.
Read more