Showing posts with label Woman. Show all posts
Showing posts with label Woman. Show all posts

নারীরা কি সম-অধিকারের মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন?

,
একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আমার কত কিছুই যে ভাবনায় আসে, তা ভেবে আমি নিজেই বিরক্ত হই। ভাবব না ভেবেও অনেক কথা ভেবে ফেলি, আবার তা লিখেও ফেলি। আমরা নারী মানুষরা অনেক সচেতন, আমাদের অধিকার নিয়ে। মাঝেমধ্যে এই ভাবনা সত্য বলে মনে হয়। কিন্তু আসলেই কি আমরা আমাদের অধিকার নিয়ে সচেতন? আমাদের মর্যাদা নিয়ে আমরা কতটা ভাবি? কোথাও কোনো লাইনে দাঁড়াতে সম-অধিকার পেলে, বাসে কিছু সংরক্ষিত আসন পেলে, নারী দিবসে কিছু বিশেষ গুরুত্ব পেলে বা সংসারে পুত্রসন্তানের সঙ্গে খাদ্য-শিক্ষায় সমভাগ পাওনা আদায় করতে পারলেই আমাদের অধিকার আদায় হচ্ছে ভেবে পরিতৃপ্ত হই। কিন্তু তাতেই যে আমাদের সঠিক মর্যাদা পেয়ে যাচ্ছি না তা কি আমরা এই নারী মানুষরা বুঝতে পারছি? না, পারছি না। এখনো আমাদের বিপণনের বিশেষ পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে আমরা মোটেও সচেতন নই। কোনো অফিশিয়াল অভিষেক, বিশেষ কোনো সভা-সম্মেলনে সুন্দর পোশাকে নারীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে অযাচিতভাবে নারীর সৌন্দর্য ব্যবহার করা হচ্ছে। বিলবোর্ডগুলোতেও তার যথেচ্ছ ব্যবহার। এটা আমাদের অজান্তে হচ্ছে, না আমরা নিজেরাই নিজেদের ব্যবহার করছি, তা কি কখনো ভেবে দেখেছি? একজন নারীর যেমন সৌন্দর্য আছে, তেমনি আছে পুরুষেরও।
সেখানে নারীরাই শুধু কামোদ্দীপক, এই ভাবনা কোথা থেকে আসে? এটা কি পুরুষশাসিত সমাজের ভাবনা থেকে আসে না? আর আমরা কিনা তাতে প্রচ্ছন্ন সায় দিয়ে নিজেরাই পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছি! পাঠকরা ভেবে দেখুন, একটা শেভিং জেল বা ব্লেডের বিজ্ঞাপনে নারীর উপস্থিতি ছাড়া আর কোনো পথ কি আসলেই নেই! অধুনা দেখছি, আমের জুসের একটা বিজ্ঞাপন_সেটা দেখে যারপরনাই বিস্মিত আমি। সে বিজ্ঞাপনের নায়ক শৈশব-কৈশোরে আমের ছলনায় হতাশাগ্রস্ত। ভালো কথা। যৌবনেও আম তাকে ছলনা করছে, ঠিক সে সময়ই দেখা যায় নারীর উত্তেজক পৃষ্ঠদেশ। এর সঙ্গে আমের সম্পর্ক? বৃদ্ধাবস্থায় আম চুপসানো বেলুন হয়ে তার হাতে নিষ্পেষিত! এখানে কি বলা হয়েছে? এ রকম দ্বৈত অর্থবোধক বিজ্ঞাপনে অংশগ্রহণকারী নারী কি জেনেবুঝে অভিনয় করেছেন? আমাদের মানবাধিকার অধিদপ্তরের নারী আইনজীবীরা একটু মনোযোগ দিলে আমি খুবই খুশি হব। পথে চলতে চলতে বিশাল বিশাল হোর্ডিংয়ে নারীদের উপস্থিতিও আমাকে বিব্রত করে। ভারতীয় একটা গয়নার কম্পানি সারা দেশে উদোম গায়ে নারীদের গয়না পরিয়ে দিগন্তজুড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমাদের কোন মা-বোন-কন্যা দামি গয়না গায়ে তুললে জামা পরা ভুলে যান, এটা আমার জানতে ইচ্ছে করে! সেই হোর্ডিংগুলোতে ব্লাউজ ছাড়াও অথবা একচিলতে বক্ষবন্ধনী পরে শাড়িতে নিজেকে উদ্ভাসিত করেছেন।
আমাদের দেশে অতি নিম্নবিত্ত নারীরা কাপড়ের অভাবে অনেক সময় ব্লাউজ ছাড়া শাড়ি পরেন, সেটা তাঁদের সৌন্দর্যকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে নয়, এটা বলাই বাহুল্য। মানুষ আদিম যুগে কাপড় আবিষ্কারের আগে উদোম থাকত, ক্রমান্বয়ে তারা উপায় না পেয়ে গাছের পাতা, পশুর চামড়া দিয়ে লজ্জা নিবারণের চেষ্টা করেছে। মানুষ যত ভদ্র হওয়া শুরু করল, ততই তার লজ্জা বাড়ল। কাপড় দিয়ে শরীর ঢাকা একটা শিক্ষার অংশ হয়ে দাঁড়াল। আমাদের এই বাংলাদেশ, বাংলা সংস্কৃতি, একটা মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে সব সময়। তারা অন্য মুসলিম রাষ্ট্রের মতো কালো জুব্বাও পরে না, আবার পাশ্চাত্যের মতো কাপড়ও খোলে না। অথচ এখন জামাকাপড়ের বাঁকগুলোতে নারীকে উদ্ভাসিত করার চেষ্টা চলছে জোরেশোরে। মশারির জালের শাড়ি, হাঁটু পর্যন্ত সালোয়ার_এগুলোকে সভ্যতা জানলে আমি অন্তত তা মানি না। এখনো আমাদের দেশে পুরুষরা এমন কাপড়ে ও এই পোশাকে পরনারীকে দেখে চোখ জুড়ালেও নিজের স্ত্রী-মা-বোনকে এমনভাবে দেখতে পছন্দ করেন না। তার মানে, মৌলিক ভাবনায় তাঁরা এখনো সেটা মেনে নিতে পারেননি। তাহলে? আর একটা কথা বলি, পুরুষদের কি উত্তাল সৌন্দর্য নেই? তারা কিন্তু কাপড় খোলেন না যথাতথা! অন্যকে ব্যবহার করতেই বোধ করি তাদের স্বাচ্ছন্দ্য।
আমরা কেন আমাদের ব্যবহার করার অবাধ সুযোগ করে দেব? আর একটা কথা বলি, আসল সৌন্দর্য আসে অভিজাত পোশাকে, সে পোশাক অবশ্যই মার্জিত হতে হয়। ৬৮ হাজার মাখলুকাতের মধ্যে একমাত্র মানুষই তার লজ্জা ঢাকতে কাপড় পরে। নারীর যথেচ্ছ ব্যবহার ও কাপড়হীনতায় আর যা-ই হোক, নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা হয় না। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে এই পৃথিবীতে পুরুষরাই কিন্তু সহজাত সৌন্দর্যের অধিকারী। পুরুষ পশুরাও। যেমন_বাঘ, সিংহ, ময়ূর পাখি_সব শ্রেণীতেই পুরুষরা কেশর, পেখম, ঝুটি ইত্যাদির অধিকারী। আর মানুষ পুরুষ? তারা কি লিপস্টিক মাখে? গালে রং মাখে, চোখে আলগা পাপড়ি লেন্স দিয়ে শরীরের কিছু অংশ উদোম রেখে ঘুরে বেড়ায়? না, কখনোই না। তার মানে, সেটা তাদের সহজাত এবং প্রচ্ছন্ন সৌন্দর্য। তবে আমরা নারীরা কেন অন্তর্গত বুদ্ধিদীপ্ত সৌন্দর্যের চর্চা না করে সারাক্ষণ চুন-কালি মেখে ঘুরতে থাকব? একজন সুফিয়া কামাল, সেলিনা হোসেন, ইন্দিরা গান্ধী বা বেগম রোকেয়ার মতো সরল স্পর্ধার মানুষ কি আমরা পাব না? আমরা কি মুখোশের ঘেরাটোপে পড়ে নির্লজ্জভাবে ব্যবহৃত হতে থাকব? ক্ষয়িষ্ণু এই পৃথিবীতে এ প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর আমি হয়তো কখনোই পাব না।

Partner site : online news / celebrities /  celebrity image
website design by Web School.
Read more

মা-মেয়ের সংগ্রাম কি শেষ হবে না?

,
কবি রুবি রহমানের সঙ্গে বহু দিন দেখা করার সাহস করে উঠতে পারিনি। তাঁর মুখোমুখি হওয়ার সাহস আমার ছিল না। তাঁর সঙ্গে যদি দেখা হয়েই যায়, তাঁকে কী বলব, তা আমি জানতাম না।
ঘটনার তিন বছর পেরিয়ে গেল। গত ৩ আর ৪ ডিসেম্বর ছিল রুবি আপার সন্তান ও স্বামীর মৃত্যুর তৃতীয় বার্ষিকী।
রুবি আপার ছিল সুখের সংসার। তাঁর স্বামী দেখতে ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের মতো। শ্রমিকনেতা নূরুল ইসলাম। সদালাপী বিনয়ী এই ভদ্রলোককে মনে হতো অজাতশত্রু। কবি রুবি রহমান মানেই যেন স্নিগ্ধতা। তাঁর চলাফেরা, কথাবার্তায় বৃষ্টিধোয়া কাঁঠালচাঁপা ফুলের শান্ত স্নিগ্ধতা। তাঁর মতোই তাঁর কবিতাও খুব পরিমিত, সুরুচি-সুন্দর। তাঁকে দেখে আসছি সেই ১৯৮৭ সাল থেকে, জাতীয় কবিতা উৎসব উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে কবি রুবি রহমান আসতেন। সঙ্গে আসত তাঁর কিশোরী মেয়েটি—মৌটুসী ইসলাম।
রুবি রহমানের সঙ্গে আমার একটা বিশেষ হূদ্যতা আছে। দেখা হলেই আমাদের দুজনের মধ্যে একটা বার্তা বিনিময় ঘটে যেত। রুবি রহমান আমার কাছে কবিতা চাইতেন। তিনি কালি ও কলম-এর সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দেওয়ার পরও আমার কাছে গদ্য চাননি, কবিতাই চেয়েছেন। তিনি আমাকে বলতেন, ‘আনিস, আমি কিন্তু তোমার কাছে কবিতাই চাইব। গদ্য আমি তোমার কাছে চাই না।’
আমি খুব খুশি হতাম।
রুবি আপার কাছ থেকেও আমি আশা করতাম কবিতার অপূর্ব পঙিক্তমালাই।
এক ছেলে তমোহর, এক মেয়ে মৌটুসী, কবি রুবি রহমান আর শ্রমিকনেতা গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি নূরুল ইসলাম; তাঁদের ছিল সোনার ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখা ছবির মতো সংসার।
রুবি আপা ২০০৮ সালে গেলেন আমেরিকার আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে, আন্তর্জাতিক লেখকদের আবাসিক কর্মসূচিতে। আপনারা যাঁরা আমার লেখা নিয়মিত পড়েন, তাঁরা জানেন, ২০১০ সালে একই কর্মসূচিতে বাংলাদেশ থেকে আমিও গিয়েছিলাম। ওখানে কী কী করেছি, তার কিছু কিছু বর্ণনা আপনারা প্রথম আলোর এই কলামেই গত বছর পড়েওছেন। রুবি রহমানও আনন্দের সঙ্গেই গিয়েছিলেন আমেরিকায়। ৩ মাসের কর্মসূচি তখন শেষ। তিনি এসেছেন ওয়াশিংটন ডিসিতে। তাঁর মেয়ে মৌটুসীর বাসায়। মৌটুসী কাজ করেন একটা বিশ্বসংস্থায়। ঢাকায় রুবি আপার ছেলে ৩৮ বছরের তমোহর আছে। আছেন নূরুল ইসলাম। প্রোগ্রাম শেষ। মেয়ের বাসায় কয়েক দিন থেকেই ঢাকা ফিরে আসবেন রুবি রহমান।
ঢাকায় সে সময় চলছে নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়ে উত্তেজনা। সামনে নির্বাচন। নূরুল ইসলাম প্রার্থী হবেন মহাজোট থেকে, সেই রকমেরই প্রস্তুতি চলছে।
ঠিক এই সময় ঢাকায় ঘটে যায় সেই হূদয়বিদারক ঘটনা। ৩ ডিসেম্বর রাতে লালমাটিয়ার ফ্ল্যাটে কী একটা রহস্যময় বিস্ফোরণ ঘটে, তাতে সে রাতেই মারা যান তমোহর, পরের দিন মৃত্যুবরণ করেন নূরুল ইসলাম।
কীভাবে খবর পেলেন কবি রুবি রহমান?
কীভাবে তিনি ছুটে এলেন ঢাকায় এটা দেখতে যে তাঁর ছেলে ও স্বামী আর নেই?
কীভাবে এসেছিলেন মৌটুসী, যিনি তাঁর বাবা ও ভাইকে আর কোনো দিনও দেখবেন না।
রুবি রহমানের সামনে এরপর থেকে দাঁড়াতে পারি না। তাঁর চোখের দিকে তাকাতে পারি না। তাঁকে একটা সান্ত্বনার বাক্যও আমি বলতে পারিনি। স্বামী আর পুত্রকে রেখে আমেরিকায় গিয়ে ফিরে এসে যিনি দেখেছেন তাঁদের মৃতদেহ, সেই মানুষটাকে কীভাবে সমবেদনা জানাতে হয় আমি জানি না।
এই পরিবারটি এবং তার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের সচেতন মানুষ, সেই দিন থেকে নূরুল ইসলাম ও ইসলাম তমোহর নিহত হওয়ার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়ে আসছে। গত পরশু, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০১১, তাঁদের মৃত্যুর তৃতীয় বার্ষিকীতেও দুটো কর্মসূচি পালিত হয়েছে। দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় মৌন মানববন্ধন হয়েছে। সেখানে মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ অনেকেই দাঁড়িয়েছিলেন হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে প্রকাশিত পোস্টার শরীরে সেঁটে। মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘বিজয়ের মাস এলে মানুষ আনন্দ বোধ করে। কিন্তু তিন বছর ধরে ডিসেম্বরে আর আনন্দ করতে পারছি না। যাঁরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন, যাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, তাঁদেরই একজনকে হত্যা করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, কয়েক দিন আগে নূরুল ইসলামকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। আমরা জানতে চাই, কারা হুমকি দিয়েছিল।’
শনিবারেই বিকেল বেলা নূরুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে গঠিত নাগরিক কমিটি আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন। বক্তব্য দেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, আওয়ামী লীগের নেতা তোফায়েল আহমেদ, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, আওয়ামী লীগের নেতা নুহ-উল আলম লেনিন, পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান, কবি মহাদেব সাহা। সভা সঞ্চালন করেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে উপস্থিত ছিলেন, মতিয়া চৌধুরীর মতো জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ছিলেন। এর আগে, সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও নূরুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে আয়োজিত কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন। রুবি রহমান নিজেই এখন আওয়ামী লীগের সাংসদ।
এরপরও মৌটুসী তাঁর ভাই হত্যা, পিতৃহত্যার দাবিতে সংগ্রাম করতে করতে যেন জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছেন। রুবি রহমান যেন ভেঙে পড়ছেন।
রুবি রহমান আর মৌটুসী এই মা-মেয়েকে যেন উজানস্রোতে নৌকা বাইতে হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডও ধামাচাপা পড়ে যাবে। এই দুই নারী কোনো দিনও তাঁদের স্বজন হত্যার বিচার পাবেন না।
এই আশঙ্কার কারণ আছে। কারণ, যাকে তাঁরা বলছেন হত্যাকাণ্ড, কেউ কেউ তাকে একটা হঠাৎ ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দিতে চান। প্রচার করা হয়েছে, ফ্রিজ বিস্ফোরণে এই ঘটনা ঘটেছে।
অথচ ফ্রিজের গ্যাস সিলিন্ডার অক্ষত আছে। ফিজের সঙ্গে বিদ্যুতের কোনো সংযোগ ছিলই না।
বলা হয়েছে, শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। অথচ শর্টসার্কিটের কোনো চিহ্নই নেই ওই গৃহে।
তাঁরা বলছেন, ওই দিন তাঁদের বাসগৃহের প্রবেশদ্বারের চাবি বাঁকানো ছিল। কে বাঁকিয়েছিল?
গ্রিলও বাঁকানো ছিল।
মৌটুসী এর আগে প্রকাশিত তাঁর লেখায় এসব প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানতে চান, কেই বা ২ ডিসেম্বর ২০০৮-এ নোয়াখালী সফররত নূরুল ইসলামকে ফোন করে ঋণখেলাপি হিসেবে তাঁর নাম উঠেছে বলে তাঁকে ডেকে ঢাকায় এনেছিল?
এসব প্রশ্ন নিয়ে মৌটুসী একবার সংবাদমাধ্যমের অফিসে, একবার মন্ত্রী-নেতাদের বাড়িতে কিংবা দপ্তরে, একবার পুলিশের উচ্চকর্তাদের দ্বারে হন্যে হয়ে ঘুরছেন।
কথার মালা গাঁথা হচ্ছে, কিন্তু তদন্ত ঠিক পথটা খুঁজে পায় না। এই মামলা ‘চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে’ গণ্য করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল বিশেষভাবে এই মামলা পর্যবেক্ষণে রেখেছে। তবু তদন্ত এগোয় না কেন?
তখনই ভয়ে আমাদের শরীর হিম হয়ে আসে। আওয়ামী লীগের এমপি তাঁর স্বামী ও সন্তান হত্যার বিচার পান না! মহাজোটের সম্ভাব্য প্রার্থীকে মেরে ফেলা হলো, সেই মহাজোট বিপুল ভোটে জিতে ক্ষমতায় এল, তারপরও সেই হত্যারহস্যের কিনারা হয় না। স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেই নিহতের স্মরণসভায় উপস্থিত থাকেন, সেই নিহত তাঁর মৃত্যুর বিচার পান না?
রুবি রহমানের মুখের দিকে তাকানোর সাহস তাই আমরা হারিয়ে ফেলি। তাঁর মেয়ে মৌটুসী যখন বিচারের দাবিতে জনমত সংগঠনের জন্য প্রাণান্তকর পরিশ্রম করেন, আমরা তাঁকে সমর্থন দিই, কিন্তু আশ্বাস দিতে পারি না।
এবার বোধহয় সময় এসেছে সত্যিকারের একটা পরিবর্তন আনার। অর্থবহ কিছু একটা করার। শ্রমিকনেতা নূরুল ইসলাম হত্যা মামলাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার। আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে এই ‘হত্যাকাণ্ডের’ সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা যাবে না, আমাদের তা মনে হয় না। মৌটুসী ইসলাম ও অন্যরা যে প্রশ্নগুলো তুলছেন, সেসবের উত্তর তো আমাদের পেতে হবে। সেসব প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব পাওয়ার পরে যদি একটা সিদ্ধান্তে আসা যায়, সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে নিশ্চয়ই কারো আপত্তি থাকবে না।

Partner site : online news / celebrities /  celebrity image
website design by Web School.
Read more

নারীরা একটু একটু করে আলোর মিছিলে শামিল হচ্ছে

,
ব্যক্তিগত কাজে কয়েকদিন দেশের বাইরে ছিলাম। ফিরে এসে পুরনো পত্রিকা নিয়ে বসলাম। গত ৭ দিনের পত্রিকার হেড লাইনগুলোর ওপর চোখ বুলাচ্ছিলাম। সেই একই খবর। 'নরসিংদীর পৌর মেয়রকে গুলি করে হত্যা, 'থমকে আছে মহাসড়ক।' দুর্ঘটনা ও অবরোধে যানজট দুর্ভোগ ঘরমুখী মানুষের। সড়ক দুর্ঘটনায় মা-মেয়ের মৃত্যু। 'শেয়ার বাজারে দরপতন' ইত্যাদি পুরনো সব খবর। দুই নেত্রীর পরস্পরের প্রতি অসহিষ্ণুতা। চমক লাগানো কোন সংবাদ চোখে পড়ল না। নতুন কোন খবর পাব না জেনেও ১৩ তারিখের পত্রিকা দেখতে বসলাম। প্রথম পৃষ্ঠা জুড়ে সেই মন খারাপ করা সব খবর। 'পুরনো শ্রমবাজার বন্ধ, নতুন খোঁজ মেলেনি' 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, তিন ইউপি সদস্যসহ নিহত ৭' 'বাস ভাড়া নিয়ে মালিকদের সেই পুরনো খেলা' ইত্যাদি। শেষ পৃষ্ঠার হেড লাইনে চোখ বুলাতে গিয়েই ছোট্ট হেড লাইনে আসা একটি খবরে চোখ আটকিয়ে গেল। 'কন্যা সাহসিকা'। গত ১১ নভেম্বর শুক্রবার বরগুনার আমতলীতে এক বিয়ের আসরে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ কনেকে বরের হাতে তুলে দেয়ার পালা এ সময় যৌতুক দাবি করে বসে বরপক্ষ আর এতেই বাধে বিপত্তি। ক্ষুব্ধ কনে ফারজানা তখনই বরকে তালাকের ঘোষণা দেন। খবরটা বার বার পড়ে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। বার বার খবরটা পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম। যে দেশের নারীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনো অবস্থান নাজুক। এই একবিংশ শতাব্দীতেও সমাজ এবং রাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বেঁচে আছে এবং বেড়ে উঠছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা এখনো পুরুষের অধস্তন। পুরুষের যেকোন সিদ্ধান্তকে নারীকে নতমস্তকে মেনে নিতে হচ্ছে প্রায় সব ক্ষেত্রে। সেই সমাজে বাস করে সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিকে, ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে নিজের মত প্রকাশের এমন সাহসী পদক্ষেপ কীভাবে এত অল্প বয়সে একটি মেয়ের পক্ষে নেয়া সম্ভব হলো? আমি এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম শুনলাম।
বিয়ের আসরেই নিজের স্বাধীন মত প্রকাশের 'অধিকার' এবং 'ঔদ্ধত্যকে' সমাজ কীভাবে নেবে, পরিবার আশ্রয় দেবে কি-না, আগামী দিনগুলোতে কী কী প্রতিকূল অবস্থার ভেতর দিয়ে যেতে হবে। কোন কিছুতেই বিচলিত না হয়ে ঘৃণাভরে এ সাহসিকা কন্যা যৌতুকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে।
দেখা গেছে বাংলাদেশের ৫০ শতাংশ বিবাহিতা নারী যৌতুকের কারণে শারীরিক অথবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। আমাদের দেশে যৌতুকের কারণে এখনো বহু নারীকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হচ্ছে। এমএমসির এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত বছরের এপ্রিল-আগস্ট সময়ে যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩৩ জন অন্তঃসত্ত্বা নারী। আমাদের দেশে প্রতি সেকেন্ডে একজন নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় নারীকে এখনো সহ্য করতে হচ্ছে, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক নারীর অবস্থান এখনো নাজুক। নির্যাতন, নিপীড়ন এবং অনেক সময় বেছে নিতে হয় আত্মহননের মতো চরম পথ। সামাজিক এ অবস্থার প্রেক্ষাপটে, 'লড়াকু' এই মেয়ের সাহসিকতার প্রশংসায় নিশ্চয় বিভিন্ন নারী সংগঠন অভিনন্দন জানিয়েছে। এই প্রত্যাশা নিয়ে পরের সংখ্যার বিভিন্ন পত্রিকাগুলো খুঁজলাম। আতিপাতি করে খুঁজে কোথাও কোন নারী সংগঠনের বক্তব্য পেলাম না। হতাশ হয়ে ভাবলাম, বিভিন্ন নারী সংগঠন দক্ষিণ এশিয়া ফোরামে তাদের কর্মতৎপরতা চালাচ্ছে, নারী আন্তর্জাতিক দিবসগুলোতে নারী অধিকারে জ্বালাময়ী বক্তৃতা, মিটিং ও মিছিল করছে। অথচ এই মেয়েটি কী তার সাহসিকতার জন্য একটা অভিনন্দন পাওয়ারও যোগ্য নয়? কোন মিডিয়া বা নারী সংগঠন এ মেয়েটিকে একটু অভিনন্দন পর্যন্ত জানায়নি। মনে হয় এ সাহসিকা কন্যা সাহসদাতাদের এজেন্ডায় নেই। নারী সংগঠনগুলো ডোনারদের এজেন্ডা পূরণ করেই সময় পাচ্ছে না দেশের কোথায় কোন কোন মেয়ে পুরুষের যৌতুক লোভের বিরুদ্ধে কি বিদ্রোহ রয়েছে তার খোঁজ রাখার সময় কোথায় তাদের।
নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য একটি দিনকে বেছে নিয়ে আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব কিছু কর্মসূচি পালন করেই যেন নারী সংগঠনগুলোর 'নারী নির্যাতন বিরোধী' তৎপরতা শেষ। না ভুল বললাম, কর্মসূচির ভিডিওচিত্র দাতাদের কাছে না পাঠানো পর্যন্ত নারী সংগঠনগুলোর কর্মসূচি শেষ হয় না। প্রতিদিন অধিকার আদায়ের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। অনেকে মনে করেন, অর্থনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় হলে নারী নির্যাতনের মাত্রা কমবে। এ সত্যতা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। এর জ্বলন্ত উদাহরণ_ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রুমানা। সামাজিক এবং পারিবারিক অবস্থার কথা ভেবে স্বামীর নির্যাতন সয়ে গেছেন একজন উচ্চশিক্ষিত নারীও।
খোঁজ নিলে দেখা যাবে বেশিরভাগ নারীই শুধু যে নির্যাতনকারীর শাস্তি এড়িয়ে যায় তা নয় বরং তা নীরবে সহ্যও করে যায়।
সমগ্র বিশ্বে যখন নারী ও শিশুর নিরাপত্তার জন্য এবং নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে সেখানে আমাদের দেশে নারী এবং শিশু নির্যাতন বাড়ছেই। বিশ্ব জনসংখ্যা তহবিলের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে ৪৭ শতাংশ নারী পারিবারিক অঙ্গনে পুরুষের দ্বারা নির্যাতিত হয়।
প্রতিদিনই আমাদের চারপাশে কোন না কোন নারীর ওপর মানসিক অথবা শারীরিক অত্যাচার হচ্ছেই। নারীরা যে কতভাবে নির্যাতিত হচ্ছে_ তা আমরা প্রায় প্রতিদিনের পত্রিকা থেকে কিছু হলেও জানতে পারি। যৌতুকের জন্য পুড়িয়ে মারা, ধর্ষণের পর খুন, এসিড নিক্ষেপে মুখম-ল জ্বালিয়ে দেয়া, ফতোয়ার কারণে একঘরে করে রাখা ইত্যাদি বিভিন্ন বর্বরোচিত কায়দায় নির্যাতন করা হয়। এখন নির্যাতনের আর একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। পৈশাচিক উল্লাসে ধর্ষণের ছবি ক্যামেরাবন্দী করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়।
অথচ প্রচলিত আইনানুযায়ী প্রতিটি অপরাধের শাস্তির বিধান আছে। এসিড নিক্ষেপ এবং যৌতুকের কারণে কারও মৃত্যু হলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-। নানা ধরনের আইনি জটিলতার কারণে শাস্তির প্রয়োগও ঠিকমতো হয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। যৌতুকের জন্য যাদের পৈশাচিক আচরণের শিকার হতে হয় তারা অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। যৌতুকের কারণে বীভৎস খুনের খবর জানা যায় প্রায় প্রতিদিনের পত্রিকাগুলোতে। যৌতুক প্রথা গোটা সমাজের নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
এখনো অনেক পরিবারেই মেয়ে সন্তানকে বোঝা মনে করা হয়। ছেলে সন্তানদের জন্য যে অর্থ ব্যয় করে, মেয়ে সন্তানদের জন্য সেই অর্থ ব্যয় করতে অনেক অভিভাবককেই অনীহা প্রকাশ করতে দেখা যায়। এই মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। এমনকি মেয়েদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা পর্যন্ত এখনো অনেক অভিভাবক মেনে নিতে পারে না। তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাটাকেই জোর করে চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এর ব্যতিক্রমও যে আছে তার উদাহরণ হিসেবে এখানে বরগুনার সেই 'সাহসী কন্যা'র অভিভাবকদের কথা বলতেই হয়। যৌতুকের দাবিতে কনে যখন বিয়ের আসরেই ঘরভর্তি মানুষের সামনে যৌতুকলোভী বরকে তালাক দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মেয়ের বাবাও সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের সিদ্ধান্তকে মেনে নেন। তিনি উপস্থিত সবার সামনে বলতে দ্বিধা করেননি 'আমার শিক্ষিত মেয়ের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই মেয়ের তালাক দেয়াকে সমর্থন করছি।'
বরগুনার সেই অভিনন্দনযোগ্য অভিভাবক সবার অনুকরণীয় হতে পারেন। সমাজের ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে মেয়ের মতামতকে মূল্য দিতে যে বাবা দ্বিধা করেননি।
যে সমাজে মেয়েদের এখনো ছোটখাট ত্রুটি-বিচ্যুতিতে সমাজপতিদের খড়গ নেমে আসে। মেয়েদের বোঝা মনে না করে স্বাবলম্বী করাটাই সবার আগে বিবেচিত হওয়া উচিত। নির্যাতন এবং হয়রানির ভয় নারীর সামগ্রিক গতিশীলতার পথে একটি বড় বাধা। নারীকে শৃঙ্খলিত করে রাখার প্রবণতা সেই অতীতকাল থেকেই চলে আসছে।
সেই যে হিন্দু শাস্ত্রকার মনু বলে গেছেন, নারী কুমারীকালে বাবার, যৌবনে স্বামীর ও বার্ধক্যে ছেলের তত্ত্বাবধানে থাকবে। নারী কখনো স্বাধীন থাকার উপযুক্ত নয়। সেই ধারণা থেকে অনেকেই বের হয়ে আসতে পারেনি। শুধু নারী হয়ে জন্মানোর কারণেই নারীর মেধা, যোগ্যতা, আত্মত্যাগও সমাজে স্বীকৃতি পায় না।
জাতিগত বিদ্বেষের মতোই এটি ক্ষমতার একটি নির্মাণ। নারীর প্রতি সহিংস আচরণের আর একটি কারণ সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদের উত্থান। নারীকে এরা সবসময় নিয়ন্ত্রণ করতে চায় এবং পুরুষের সেবার জন্যই নারীর সৃষ্টি। এ অপশক্তি নারীর সব রকম মানবিক অধিকারকে অস্বীকার করে।
নারীর বিরুদ্ধে সহিংস আচরণ এবং নির্যাতন বন্ধে শুধু শাস্তি প্রয়োগই একমাত্র সমাধান নয়। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। একই সঙ্গে সম্মিলিত নারী সমাজকেও লড়াই চালিয়ে যেতে হবে সব ধরনের বৈষ্যমের বিরুদ্ধে। মনে রাখতে হবে নারীকে পেছনে রেখে বা কোণঠাসা করে রেখে কোন জাতিরই উন্নতি সম্ভব নয়।
তবে আশার কথা নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং প্রতিবাদ ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। নারী নির্যাতনের ঘটনার বিরুদ্ধে এক ধরনের সামাজিক প্রতিরোধও গড়ে উঠছে। মেয়েরা এখন যৌতুকের বিরুদ্ধে, ফতোয়ার বিরুদ্ধে, এমনকি ধর্ষণের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হতে শিখেছেন।
নিজের অধিকারের লড়াই প্রতিদিন চালিয়ে যেতে হবে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস বা আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন বিলোপ দিবসই শুধু নয়, নিজেদের যোগ্যতায় নারীরা আজ বিচারব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, রাজনীতিবিদ, সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থায় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন। অন্ধকারের পথ কেটে নারীরা এখন একটু একটু করে আলোর পথের মিছিলে শামিল হতে শিখেছেন।

Partner site : online news / celebrities /  celebrity image
website design by Web School.
Read more

মেয়ে তোমার নিরাপত্তা কোথায়

,

প্রভাতের সি্নগ্ধ কোমল-রেশম আলো চোখের পাপড়ি ছুঁইয়ে গেলে যে মেয়ে দৃষ্টি মেলে অনাগত দিনের সফলতা আর সুমধুর স্বপ্নকে লালন করে। পৃথিবীকে দেখছে সে মাত্র ১৪-১৫ বছর ধরে। শিশুকাল থেকেই অধ্যবসায় ও সাধনার মাধ্যমে বড় হতে হয়। এ ধ্যান-জ্ঞান স্মরণে রেখে সর্বদাই ছুটেছে পরীক্ষার সন্তোষপূর্ণ ফলাফলের দিকে। পিতা-মাতাসহ নিকট আত্মীয়দের সম্মানিত করার জন্য ঐটুকু কচি দেহ-মনে প্রচেষ্টা নিরন্তর ছিল। প্রতিদিন যে কিশোরী একটু একটু করে পৃথিবীকে আবিষ্কার করতো বিস্ময় আভাসে। কিন্তু কখনো তার ঘূর্ণাক্ষরেও মনে হয় নেই যে হাঙ্গর, কুমির, দৈত্য-দানব তার চারপাশেই মানুষের মুখোশ পরিধান করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সময়-সুযোগ পেলেই বিশাল হাঁ করে বিষদাঁত ফুটিয়ে দেবে তার নিষ্পাপ দেহবরণে। প্রতিটি পুরুষই মাতৃগর্ভ থেকে জন্মলাভ করে আবার কন্যা সন্তানের জনক হয়। তথাপিও কী করে পারে সন্তানতুল্য অথবা আদরের ছোটবোন তুল্য নিজ ছাত্রীটিকে পৈশাচিক লালসার শিকার করে চরম লজ্জাজনক আর অপমানজনক এ রকম জঘন্য নোংরা পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিতে।
বাংলাদেশের মেয়ে শিশু, বালিকা, কিশোরী, তরুণী, যুবতী, মধ্যবয়সী এবং বৃদ্ধকাল পর্যন্ত বিভিন্ন সুযোগে মনগড়া নিয়মে নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে এ নির্যাতনের আধিক্য আর বহুমাত্রিক রূপ বিশেষ করে নিত্য-নতুন পদ্ধতিতে, আঙ্গিকে মেয়েরা নির্যাতিত হচ্ছে। গত ৫ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপিকা রুমানা মঞ্জুরের ওপর তার স্বামীর বর্বর আক্রমণের পরই আবার রাজধানীর সুনামখ্যাত স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভিকারুননিসার দশম শ্রেণীর ছাত্রী কোচিং করতে গিয়ে বাংলার শিক্ষক পরিমল জয়ধর দ্বারা প্রতারণা ও পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়। গত ৫ জুলাই প্রকাশিত ওই খবরটিতে হীম হয়ে যায় স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ। এর সঙ্গে কয়েকটি প্রশ্ন অজান্তে বিবেকের কড়া নারে। কে এই জয়ধর, তার বিস্তারিত পরিচয় কী? কীভাবে সে নিয়োগ পেল এমন একটি নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে? একদিনে তার দুঃসাহস পাহাড়ের চূড়ায় ওঠেনি। এর পশ্চাদে ইন্ধন আছে, আশ্বাস আছে এবং কুপ্ররোচনা রয়েছে। পিতা-মাতা, পরিবার-পরিজনের আদরের কন্যাটি যদি বিদ্যার্জন করতে গিয়ে স্বয়ং গুরুদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয় সে যন্ত্রণার গভীরত্বের পরিমাপ ভুক্তভোগী ছাড়া কারো পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। মা-বাবা কীভাবে নিজেদের সান্ত্বনা দেবেন এমন অবস্থায় তাদের বুকের ধন লুণ্ঠিত হয়েছে_ যেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা তারাই অর্থ ব্যয় করে করে দিয়েছেন। অসহায় এ অবস্থা থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে জাতিকে আরো কঠোর, নিয়মতান্ত্রিক আর সুপরিকল্পনা মাফিক অগ্রসর হতে হবে। জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে সুনিপুণভাবে দায়িত্ব-কর্তব্য পালন এবং চরিত্রের সততা বজায় রাখার মানবিক শিক্ষা পরিবার থেকেই দেয়া উচিত। সুস্থ-পবিত্র পারিবারিক বন্ধনে বেড়ে উঠলে কেউ এরকম হিংস্র-পশু হতে পারে না।
এই একবিংশ শতাব্দীতে ও বাংলার গ্রাম-গঞ্জে ফতোয়ার শিকার হয়ে অথবা গ্রাম্য সালিশিকারকদের চাপায় পরে অসহায় নারীদের, ব্যভিচারিণী, কলঙ্কিনী, অসত্য খেতাব নিয়ে দোররা, প্রহার, স্থান ত্যাগ, একঘরেসহ কত ধরনের বিচার করেন সমাজপতিরা। এই পরিমলের বিচার কতখানি দৃষ্টান্তমূলক হবে, অপরাধের তুলনায় কতটা যন্ত্রণাদায়ক হবে সে দৃশ্য দেখার জন্য উদগ্রীব আতঙ্কিত অভিভাবক মহল। কলেজের অধ্যক্ষার দম্ভ তিনি পরিয়ে দেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বান্ধবী আর পরিমলের শক্তি তার নিয়োগ হয়েছে দলীয় হস্তক্ষেপে আর তার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ। সে কারণেই সুধীজনে বলে দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়করণ মৌলিক উদ্দেশ্যকে মস্নান করে দেয়। একটি ছাত্রী ধর্ষিত হলে তার গোটা পরিবারটি ধ্বংস হয়ে যায়। নিভে যায় ভবিষ্যতের ঘরে জ্বালানো আশার প্রদ্বীপ শিখা। অবুঝ নিষ্পাপ শিশুটির মানে জন্ম নেয় সমগ্র পুরুষজাতি সম্পর্কে অশ্রদ্ধা, ক্ষোভ এবং ঘৃণা। পরবর্তী জীবনে ইতিবাচক এবং কল্যাণকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়। পুরুষ মানুষের ভেতর লুকায়িত নোংরা, জঘন্য পশুত্বের যে নগ্ন চিত্র তার সামনে উন্মোচিত হয়ে যায় তাতে তার সুস্থ-সুন্দর-স্বাভাবিক গতি মন্থর হয়ে যায়। অক্লান্ত শ্রম নিয়োগ করে মেধা বিকাশের যে উদ্যোগ তার সুপ্ত ছিল হঠাৎ বজ্রপাতে তা নিমিষে হারিয়ে যায়। সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিকতার অভাব এবং বিস্তৃতি দুর্নীতির কারণে আজ নীতিবান, আদর্শবান এবং সজ্জন মানুষের বড়ই অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
দুর্নীতিগ্রস্ত ঘুনে ধরা সমাজ ক্ষয়ে-পচে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। আর সে দৃশ্য আমাদের অসহায়ের মতো দেখতে হচ্ছে। প্রতিদিন-প্রতিনিয়ত ওই অসুস্থ সমাজের ঘূর্ণিপাকে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে কতশত কিশোরী। সুশীল সমাজ নীরব, সরকার দায়িত্বহীন রক্ষকরা রূপান্তরিত হয়েছে ভক্ষকে। এ অবস্থায় মুক্তির পথ কোথায়? শিক্ষার আলো, অনুশীলন যখন কোনো মানুষকে চরিত্রের সততা, নিয়ন্ত্রিত যৌনক্ষুধা এবং দায়িত্বশীল হয়ে ভূমিকা পালন করতে শিখায় না তখন তাকে ঘাড় ধরে আইনের কঠোর অনুশীলন এবং বাধ্যতা দিয়ে জব্দ করতে হয়। পত্রিকায় ওই পশুটির ছবির দিকে গভীর দৃষ্টি মেলে বোঝা গেল অপরাধ করে অনুশোচনার বদলে আত্মতৃপ্তিতে ভরে আছে তার অন্তর। শিক্ষক হওয়া উচিত পিতৃতুল্য, সমাজের অন্যান্য আপদ-বালাই থেকে ছাত্রীকে রক্ষা করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে।
দার্শনিক রোজার্স বহুকাল আগে একটি বাণী দিয়েছিলেন, যে শত্রুকে আমরা সন্দেহ করি না তারাই বিপজ্জনক হয়ে থাকে। শিক্ষকদের সম্পর্কে ছাত্রীদের হৃদয়ে পাহাড় সমান শ্রদ্ধাভক্তি থাকে আর ওই পাষ-গুলো সে সুযোগটাই কাজে লাগায়। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে এদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কয়েকটি মাত্র জনসমক্ষে প্রকাশ হয়। বাকিগুলো থাকে খবরের অন্তরালে। হারমান মাইনর স্কুলের ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্রী ভ্যানওয়ালা কর্তৃক নির্যাতিত হয়েছে। শরীয়তপুরে প্রধান শিক্ষক কর্তৃক বিনা বেতনে অধ্যয়নের আশ্বাস দিয়ে শিক্ষক রুমে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেছে। অবশেষে লজ্জায়-অপমানে আত্মহত্যা করেছে অসহায় দশম শ্রেণীর ছাত্রীটি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো এমন একটি পবিত্র জায়গায় না ফোটা কলিগদের কিছু হিংস্র, উন্মাদ, কামনালোভী বিকৃত রুচির পুরুষ মানুষ দ্বারা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে দুমড়ে-মুচড়ে বৃন্তচ্যুত করার নিরন্তর এ জঘন্য ধারাটির অবসান কবে হবে। এ কথা আজ সর্বজন স্বীকৃত যে, সমাজে মেয়েরা আপন-পর, ঘরে-বাইরে, আড়ালে-প্রকাশ্যে কোথাও নিরাপদ নয়। এটি এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয় যা ব্যাপক প্রকাশ করে সাক্ষী-সাবদ নিয়ে জনসমর্থন সঞ্চয় করে প্রতিকার চাওয়াও যায় না। ইজ্জত-সম্মান-মান-মর্যাদা কেবল মেয়েটিই হারাতে থাকে।
ধর্ষণের শাস্তি হওয়া উচিত মৃত্যুদ- আর শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ অথবা যে কোনো ধরনের যৌন নিপীড়নের শাস্তি হওয়া উচিত প্রকাশ্যে মৃত্যুদ-। এ মহা অপরাধ খুনের চেয়ে কিছু কম নয়। বরং বেশি। খুন হলে তো মরে গিয়ে মুক্তি পায়, কিন্তু বিশ্রি অভিজ্ঞতা স্মরণে রেখে সারাটা জীবন দুর্বিষহ কষ্টের মেঘে ছেয়ে যায়। এমন কিছু অপরাধ আছে যে অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা হলেও মনে হয় শাস্তিটা কম হয়ে গেছে। এটি এমনই একটি অপরাধ যে অপরাধের মার্জনা স্রষ্টার নিকটেও নেই। পরিমলের স্ত্রী এবং সন্তানদের উচিত কুৎসিত মানসিকতার এই লোকটিকে পারিবারিকভাবে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা। এমন চরিত্রহীন বিকৃতি লালসায় আক্রান্ত অসভ্য মানুষটি কারো স্বামী কিংবা কারো পিতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। তাদের কাছে নিজ সন্তানও নিরাপদ নয়। অসংযমী যৌনাকার দানবদের পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে বসবাস করার কোনো অধিকার নেই। আইন তাকে শারীরিকভাবে শাস্তি দিক, কিন্তু শুদ্ধিতা এবং পাপমোচনের কঠিন শাস্তি গৃহ থেকেই দিতে হবে। একক প্রচেষ্টায় যেমন একজন ভালো হতে পারে না তেমনি একার দোষে কেউ খারাপ হয় না। তার বিগত জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা কিছুতেই এ অবক্ষয় থেকে রেহাই পাবে না। এ কথাটি আবারো স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, পুথিগত বিদ্যা আত্মস্থ করলেই কেউ শিক্ষিত হয় না, সুশিক্ষিত হতে গেলে জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেককে জাগ্রত করে মানবীয় গুণাবলীর বিন্যাস ঘটাতে হয়। সবশেষে রাজ্যের সব ঘৃণা-ধিক্কার ও অভিসম্পাদ পরিমলের জন্য নির্ধারিত রেখে অভিযুক্ত স্কুলের সব প্রতিবাদী ছাত্রীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে দায়ী ব্যক্তিটির ফাঁসির দাবি করছি।
পরিমলের মতো পশুর জন্ম যেন কোনো মাতৃগর্ভে না হয়। সন্তানকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়তে পিতা-মাতাকে আদর্শবান হতে হয়। সে সঙ্গে সব কন্যা শিশুর মায়েদের প্রতি অনুরোধ রইল, শুধু বিদ্যা-শিক্ষা না_ ঘুনে ধরা সমাজের চারপাশে ওঁতপেতে থাকা হিংস্র জানোয়ারদের সম্পর্কেও সচেতন করে তুলতে হবে। শারীরিক শক্তি ও দূরদর্শিতার তালিম দিয়ে ভবিষ্যতের পথ দেখাতে হবে।

Partner site : online news / celebritiescelebrity image
website design by Web School.
Read more