Showing posts with label Muhammad Jahangir. Show all posts
Showing posts with label Muhammad Jahangir. Show all posts

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কিছু চিন্তা

,

muhammad.jahangir's picture
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র জুবায়ের হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ছাত্ররাজনীতি’ নিয়ে পত্রপত্রিকায় আবার আলোচনা শুরু হয়েছে। অনুমান করি, বিভিন্ন আড্ডায় ও পরিবারেও একই রকম আলোচনা চলছে। তবে এই আলোচনা বেশি দিন স্থায়ী হয় না। কিছুদিন পরই থেমে যায়। তখন পরিস্থিতি বা পরিবেশ সবই আগের অবস্থায় ফিরে আসে। নতুন আরেকটি ছাত্র খুন না হওয়া পর্যন্ত এই আলোচনা স্থগিত থাকে।
কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। এ প্রসঙ্গে পত্রপত্রিকার বেশির ভাগ আলোচনাই ‘পরিস্থিতির বিবরণ’ বা মন্তব্যের নামে চর্বিতচর্বন বলে মনে হয়েছে।
প্রথমে একটা কথা মোটা দাগে বলতে চাই তা হলো, দেশের মেইন স্ট্রিম রাজনীতি যত দিন দূষিত ও দুর্বৃত্তায়িত থাকবে, তত দিন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুস্থ ও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ আশা করা বৃথা। কারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকরাজনীতি দেশের মূলধারার রাজনীতির বাইপ্রডাক্ট। কাজেই মূলধারার রাজনীতি ঠিক না হলে বাইপ্রডাক্ট ঠিক হবে, এটা আশা করা বাতুলতা মাত্র।
মূলধারার রাজনীতি কবে সুস্থ হবে, কবে গণতান্ত্রিক হবে, তত দিন কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বসে থাকবে? এ রকম খুনোখুনি চলতেই থাকবে? আবাসিক হলে ক্ষমতাসীন দলের (দুই প্রধান দল) সন্ত্রাস ও আধিপত্য চলতেই থাকবে? মূলধারার রাজনীতি কলুষিত রেখে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শান্তির’ লক্ষ্যে সরকার বড় কোনো পদক্ষেপ নেবে, এমনটা কেউ আশা করে না। তবু ক্ষীণ আশা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের দেশে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর বাণী নিয়ে যুবলীগের নেতাদের পাঠাচ্ছেন। তাই মনে আশা জাগে, তিনি দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘শান্তি’ প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ হয়তো নেবেন।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, এ ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়ার জন্য বর্তমান সরকারে অনেক যোগ্য ব্যক্তি রয়েছেন। তদুপরি একজন মন্ত্রী ও একজন উপদেষ্টাও রয়েছেন। রয়েছেন বহু আওয়ামী সমর্থক কলামিস্ট ও বুদ্ধিজীবী। আমার সন্দেহ, তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথ পরামর্শ দিচ্ছেন না বা দিলেও প্রধানমন্ত্রী তা শুনছেন না। আমার মতো অভাজনের কথা শুনবেন, তেমন ভরসা পাই না। তবু লিখছি, এই অসিলায় জনগণকে আমার চিন্তা জানানোর জন্য, যাতে এ ব্যাপারে জনমত তৈরি হয়।
গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। সামরিক শাসনামলে আরও বেশি ক্ষতি হয়েছিল। বর্তমানে ছাত্রলীগের নেতারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রশ্রয়ে কীভাবে দিনের পর দিন টেন্ডার ও অন্যান্য সন্ত্রাস চালাচ্ছেন, তার সচিত্র বিস্তারিত বিবরণ প্রায় প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে। এগুলো বিএনপি বা জামায়াতের অপপ্রচার নয়।
এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় কী? কয়েকটি প্রস্তাব—এক. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক থাকতে পারবে না। ছাত্ররা নিজেরা সংগঠন করবেন ও নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের কমিটি গঠন করবেন। অনির্বাচিত কোনো কমিটি ক্যাম্পাসে কাজ করতে পারবে না। দুই. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনের ভেতরে কোনো সভা বা মিছিল করা যাবে না। তিন. প্রত্যেক কর্তৃপক্ষ আবাসিক হল ও কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের প্রত্যক্ষ নির্বাচন দিতে বাধ্য থাকবে। নির্বাচন হতে পারে দ্বিবার্ষিক। কোনো অজুহাতেই নির্বাচন বাদ দেওয়া যাবে না। চার. ছাত্রদের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট আন্দোলনের পাশাপাশি প্রত্যেক ছাত্রসংসদ বছরে একবার শিক্ষা-সপ্তাহ, সাংস্কৃতিক সপ্তাহ, নাট্য-সপ্তাহ, ক্রীড়া-সপ্তাহ ও বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করতে বাধ্য থাকবে (শুধু নেতা হওয়ার জন্য ‘নির্বাচিত’ হলে চলবে না)। এসব ‘সপ্তাহ’ যাতে বাধ্যতামূলকভাবে পালিত হয়, কর্তৃপক্ষ তার একটা ক্যালেন্ডার তৈরি করে দেবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয়ভাবে ও প্রতিটি আবাসিক হল ছাত্রসংসদকে একটি ‘বার্ষিকী’ প্রকাশ করতে হবে। পাঁচ. আগ্রহী ছাত্ররা পাস করার পর রাজনৈতিক দলের যুব সংগঠনের মাধ্যমে মেইনস্ট্রিম রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারবেন। ছাত্রজীবনে যাতে জাতীয় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত হতে না পারেন, তা দেখা সরকারের নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইন, নীতিমালা ইত্যাদি তৈরি করতে হবে। আমি মনে করি, আগ্রহী তরুণেরা অন্তত পাঁচ বছর যুব সংগঠন (ছাত্রসংগঠন নয়) না করলে তাঁকে মূল রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ দেওয়া উচিত নয়। মেইনস্ট্রিম রাজনীতি করার জন্য তার সারা জীবন পড়ে রয়েছে। ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত যুব সংগঠনে ‘ইন্টার্নি’ হিসেবে তাঁর কাজ করা উচিত। ছয়. বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগুলো পর্যালোচনা ও যুগোপযোগী করার জন্য ‘ইউজিসি’ একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করতে পারে। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, কিছু কিছু আইন শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলির সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির সুযোগ করে দিয়েছে। গণতন্ত্রচর্চার নামে লেজুড়বৃত্তি ও দলাদলিই প্রাধান্য পেয়েছে। প্রকৃত গণতন্ত্রচর্চা হয়েছে সামান্য। অবশ্য এসব আইনে লাভ হয়েছে অনেক দলবাজ শিক্ষকের। যাঁদের পেছনের সারিতে থাকার কথা, তাঁদের অনেকে উপাচার্য, ডিন, সিন্ডিকেট ও সিনেট সদস্য হয়েছেন। ‘দলকানা’ হওয়ার নানা সুবিধা। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু মধ্যম মানের শিক্ষক আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন। অতীতেও অনেকে ছিলেন। জ্ঞানী ও পণ্ডিত শিক্ষকেরা অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণে মতামত দেওয়ারও সুযোগ পান না। তাঁরা কোণঠাসা। সে জন্যই ‘বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ সংশোধন ও পরিমার্জনা করার প্রস্তাব দিয়েছি। দেশের সংবিধান কয়েকবার পরিমার্জনা হয়ে গেছে কিন্তু ‘বিশ্ববিদ্যালয় আইনে’ হাত দেওয়ার সাহস কোনো সরকারের হয়নি। সাত. রাজনৈতিক দলের ক্যাডার শিক্ষকদের উপাচার্য ও সহ-উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়ার বিধান বাদ দিতে হবে। এসব নিয়োগেই যত গোলমাল। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনটি ঘটেছে অতীতে।
পৃথিবীর অন্যান্য সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে ক্যাডারদের কি উপাচার্য করা হয়? কেউ কি বলতে পারবেন অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ বা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানরা ওই দেশের কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক? (‘কোন বনেগা ক্রোড়পতি’তে এ প্রশ্নটি অনায়াসে দেওয়া যেত।)। আট. বর্তমান আইনে উপাচার্য নিয়োগের জন্য একটি প্যানেল নির্বাচনের বিধান রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু বছর যাবর‌্যা তা আর অনুসরণ করা হচ্ছে না। কোনো শিক্ষামন্ত্রী এ প্রশ্নটি তোলেননি। বিনা নির্বাচনে কি এমপি হওয়া যাবে? যাবে না। কিন্তু উপাচার্য হওয়া যায়। ক্যাডার শিক্ষকের অনেক ক্ষমতা। আইনকে তাঁরা বুড়ো আঙুল দেখাতে পারেন। দেশের নানা অনাচার নিয়ে শিক্ষকেরা প্রায়ই কথা বলেন। কিন্তু নিজেদের উপাচার্য কীভাবে নিযুক্ত হলেন, ছাত্রসংসদের কেন নির্বাচন হচ্ছে না, এসব প্রশ্ন তাঁরা তোলেন না। ব্যতিক্রম খুব কম। প্যানেলের মাধ্যমে উপাচার্য নির্বাচনের যে বিধান রয়েছে, তা-ও ত্রুটিপূর্ণ। এটা আপাত সেমি গণতান্ত্রিক মনে হলেও এই প্যানেলের মাধ্যমেও সরকারের পছন্দসই ব্যক্তিই উপাচার্য হতে পারেন। কে কত দলবাজ ও অনুগত, সেটাই বিবেচনা করা হয়। এটা কোনো উপাচার্যের যোগ্যতা হতে পারে না, কিন্তু বাংলাদেশে তা-ই হচ্ছে।
নয়. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে অনেক আলোচনা ও বিতর্ক করা দরকার। এই পদের নিয়োগ থেকেই যত অশান্তির সূচনা। এ ব্যাপারে এমন একটি পদ্ধতি বের করতে হবে, যাতে কোনো শিক্ষক-ক্যাডার এই নিয়োগ না পান, উপাচার্য যেন কোনোভাবেই দলকানা না হন, তিনি যেন সরকার, মন্ত্রী বা ক্ষমতাসীন দলের লেজুড়বৃত্তি করতে না পারেন। উপাচার্য তাঁর প্রশাসন চালাবেন আইন ও নীতি অনুযায়ী। আইন প্রয়োগে তিনি যেন অন্ধ হন। ১০. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার পদে নিয়োগে এখন যা হচ্ছে তা কোনো সভ্য দেশে কল্পনাও করা যায় না। বলা হয়, ‘লেকচারার নয়, ভোটার নিয়োগ দেওয়া হয়।’ অন্যান্য পদেও নিয়োগ নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব দেখা যায়। তাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এন্ট্রি পয়েন্টে নিয়োগবিধি পুনর্বিন্যাস করতে হবে। ১১. সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে কোনো ছাত্র দোষী প্রমাণিত হলে তাকে শুধু বহিষ্কার নয়, অনেক বড়মাপের শাস্তি দেওয়ার বিধান থাকতে হবে (জাহাঙ্গীরনগরে জুবায়ের হত্যায় যারা দোষী প্রমাণিত হবে, তারা শাস্তি পেয়েছে সেটাই আমরা দেখতে চাই)। সন্ত্রাসীদের সহযোগীদেরও উপযুক্ত শাস্তির বিধান থাকতে হবে। কোনো ছাত্র ‘সন্ত্রাসী’ দোষী প্রমাণিত হওয়ার পরও গুরু দণ্ড না পেলে বুঝতে হবে, সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অরাজকতা বজায় রাখতে চায়। কোনো প্রতিষ্ঠানের সন্ত্রাসী গুরু দণ্ড না পেলে সেই প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস দূর হতে পারে না। দুঃখের ও ক্ষোভের বিষয়, গত কুড়ি বছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে খুন ও নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য বড় দুই দলের আমলে কেউ-ই তেমন বড়মাপের শাস্তি পায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার কোনো বড় শাস্তি নয়। বহিষ্কার করার অর্থ ওই ছাত্রকে রক্ষা করা। এসব ভোজবাজি যেন আর করা না হয়। এমন শাস্তি দিতে হবে যাতে সে জীবনে আর বড় কোনো অন্যায় করতে না পারে। মনে রাখবেন, সে একজন ছাত্রকে খুন করে এসেছে। খুন। শুধু এটা মনে রাখলেই হবে। খুন হওয়া ছাত্রটিরও একটি সুন্দর ভবিষ্যর‌্যা ছিল।
১২. এ দেশের দুর্ভাগ্য, দেশের দূষিত রাজনীতির শিকার হয়েছেন কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার নির্দোষ ছাত্রছাত্রী। এসব ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক আনন্দ থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। সন্ত্রাসী ছাত্রদের হাতে খুন হয়েছেন অনেক নিরীহ ছাত্র। আবার একই দলের সন্ত্রাসীর হাতে দলের অপর সন্ত্রাসীও খুন হয়েছে বখরা নিয়ে মতবিরোধে। ১৩. দেশের মেইনস্ট্রিম রাজনীতি কবে ও কীভাবে সুস্থ হবে, তা আমরা জানি না বা আদৌ এ দেশের রাজনীতি কখনো সুস্থ হবে কি না, তা-ও জানি না। তবে বর্তমান সরকার চেষ্টা করলে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারে। সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন পরিবর্তন করতে হবে। ‘ছাত্ররাজনীতি’ সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত দৃষ্টিভঙ্গিরও কিছুটা পরিবর্তন করতে হবে। এ রকম নানা কিছুর সম্মিলন ঘটাতে পারলে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নত হবে। ফিরে আসবে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ। শুধু বক্তৃতা দিয়ে এই পরিবর্তন সম্ভব হবে না।
১৪. আমাদের সামনে এখন দুটি চয়েস—ক. আমরা কি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক মাস পর পর নিরীহ ছাত্রের করুণ মৃত্যু, টেন্ডারসন্ত্রাস, আবাসিক হল দখল, রাজনৈতিক সন্ত্রাস ইত্যাদি দেখতে থাকব? খ. নাকি নানা আইন পরিবর্তন করে ও নতুন কিছু আইন তৈরি করে এবং তা প্রয়োগ করে ধীরে ধীরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ শিক্ষাবান্ধব করে তুলব?
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জুবায়েরের লাশ সামনে রেখে আসুন, আমরা এই আলোচনা শুরু করি।

Partner site : online news / celebrities /  celebrity image
website design by Web School.
Read more

সংবাদপত্রের প্রথম সংস্করণ ও টিভির টক শো

,

আমাদের কেন্দ্রীয় (ঢাকার) সংবাদপত্রগুলো ক্রমশ আধুনিক ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে। পৃঠাসংখ্যা বাড়ছে। বৈচিত্র্যময় রিপোর্ট, ফিচার ও কলাম প্রকাশিত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, সংবাদপত্রের পাঠক বাড়ছে। পাঠকের নানা চাহিদাও বাড়ছে।
একসময় কেন্দ্রীয় (ঢাকার) সংবাদপত্রগুলো জেলা শহর, শহরতলিতে পৌঁছাত প্রায় দুপুর বা বিকেলের দিকে। এখন সেই দিন আর নেই। কেন্দ্রীয় সংবাদপত্রগুলোর ‘প্রথম সংস্করণ’ আগেভাগে ছাপিয়ে দ্রুত বিভিন্ন জেলা শহরের দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে কাকভোরে ঢাকার সংবাদপত্র বিভিন্ন জেলা শহরের পাঠকেরা এখন পড়ার সুযোগ পায়।
কিন্তু ‘প্রথম সংস্করণ’ পত্রিকা ছাপাতে গিয়ে অনেক সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ খবর বাদ পড়ে যায়। কারণ, সব খবর বিস্তারিত ছাপাতে গেলে জেলা শহরে কাকভোরে পত্রিকা পৌঁছানো সম্ভব হবে না। সেটাও কাম্য নয়। আবার কোনো খবর থেকে জেলা শহরের পাঠকদের বঞ্চিত করাও উচিত নয়।
বাংলাদেশ ছোট দেশ বলে রক্ষা। ভারতের মতো বড় দেশ হলে আরও নানা সমস্যা হতো। আমি একবার (১৯৭৮) দিল্লিতে টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রথম সংস্করণ ছাপা হতে দেখেছি বিকেল চারটায়। আলাপ করে জানতে পেরেছিলাম, রাত দুইটা পর্যন্ত পত্রিকাটির চারটি সংস্করণ ছাপা হবে, যা ট্রেন বা বাসযোগে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে পাঠানো হবে। দিল্লির পাঠকেরা যে পত্রিকাটি হাতে পায়, তা ছাপা শুরু হয় রাত তিনটারও পর। বলা বাহুল্য, বিকেল চারটায় ছাপা পত্রিকা আর রাত তিনটায় ছাপা পত্রিকার কয়েকটি পৃষ্ঠায় ব্যাপক গরমিল থাকে। অথচ দুটোই একই তারিখের পত্রিকা। ভারতের পাঠকদের সৌভাগ্য, এখন প্রযুক্তির ও পুঁজির বিরাট অগ্রগতি হয়েছে। বহু পত্রিকা একই সঙ্গে বহু রাজ্যে, এমনকি একই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ছাপা হচ্ছে। ১৯৭৮ সালে এই সুযোগ ছিল না।
বাংলাদেশে বহুদিন যাবৎ জনকণ্ঠ আর সম্প্রতি প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও করতোয়া ঢাকার বাইরে অন্য জেলায়ও ছাপা হচ্ছে। এটাও এক বিরাট অগ্রগতি।
কিন্তু একটা সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। কিছু খবর ঢাকার বাইরের পাঠকেরা পাচ্ছে না। তারা যে পাচ্ছে না, তাও তারা জানতে পারছে না। যদি না তারা একই তারিখের ঢাকা ও জেলা শহরের পত্রিকা পড়ার সুযোগ পায়।
কয়েক দিন আগেও (২৩ ডিসেম্বর) ঢাকার একটি পত্রিকায় আমি এমন একটি খবর পড়েছি, চট্টগ্রামে বিক্রীত একই পত্রিকায় ওই খবরটির মাত্র ২৫ শতাংশ ছাপা হয়েছে। (প্রথম আলো নয়) প্রথম সংস্করণে খবরটির গুরুত্বপূর্ণ অংশই ছাপা হয়নি, যা খবরটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহলকে খুবই ক্ষুব্ধ করেছে। খবরটি ছিল ওই পত্রিকারই একটি খবরের প্রতিবাদ। প্রতিবাদের ২৫ শতাংশ ছাপা হয়েছে সারা দেশে প্রচারিত পত্রিকার সংস্করণে। আর পূর্ণ বিবরণ ছাপা হয়েছে শুধু ঢাকার সংস্করণে। এখন দেখা যাচ্ছে, আগের দিনের ‘ভুল ও অসত্য’ খবরটি সারা দেশে প্রচারিত হয়েছে, আর পরদিন প্রতিবাদ অংশটি প্রচারিত হয়েছে ঢাকায়। তাতে কী দাঁড়াল? সারা দেশের পাঠকের কাছে কি ‘ভুল ও অসত্য’ খবরটির প্রতিবাদ ও প্রকৃত তথ্য পৌঁছাল? পৌঁছায়নি। এই যে সংবাদপত্রের দায়িত্বহীনতা ও অপেশাদারিত্ব, এর জবাব কে দেবে? এর দায়িত্ব কে নেবে?
সংবাদপত্রের দুটি সংস্করণ প্রকাশ করতে হলে অনেক সময় (সব সময় নয়) কিছু খবর ও ছবি বাদ দিতেই হবে বা সংক্ষিপ্ত করতে হবে। এ ছাড়া উপায় থাকে না। পাঠককে এই সীমাবদ্ধতাটুকু বুঝতে হবে। কিন্তু এখানে সংবাদপত্র সম্পাদকের কিছুটা দায়িত্ব রয়েছে। সম্পাদক (বা বার্তা সম্পাদক) কোন খবরটি বাদ দেবেন বা সংক্ষিপ্ত করবেন? আমাদের মতে, সবচেয়ে নিরীহ খবরটিই বাদ দিতে পারেন বা সংক্ষিপ্ত করতে পারেন। যে খবরে তেমন কোনো স্বার্থ জড়িত নয়। কিন্তু ওই পত্রিকারই ভুল খবরের প্রতিবাদে ‘প্রকৃত তথ্য’ পাওয়া গেলে তা কি বাদ দেওয়া সমীচীন হবে? যদি না সম্পাদকের কোনো কুমতলব না থাকে? (অনেক সময় অনেক পত্রিকার সম্পাদক নানা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে ভুল তথ্যসংবলিত খবর প্রকাশ করেন, যা হলুদ সাংবাদিকতারই নামান্তর)
ঢাকার বাইরে সব দৈনিক পত্রিকারই বিরাট পাঠক গোষ্ঠী রয়েছে। এ ব্যাপারে তাদের সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। ঢাকার বাইরে থাকে বলে তারা ঢাকার পত্রিকার একটা অসম্পূর্ণ সংস্করণ পাবে, এটা মেনে নেওয়া উচিত হবে না। এ ব্যাপারে একটা সুচিন্তিত নীতিমালা থাকা দরকার।
আমি আগেই বলেছি, সংবাদপত্রের দুটি সংস্করণ ছাপালে প্রথম পৃষ্ঠার কোনো কোনো খবর বা ছবি বাদ দিতে হবে, কোনো খবর সংক্ষিপ্ত করতে হবে। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তাব হবে: যে খবরটি সংক্ষিপ্ত ছাপা হয়েছে, তার নিচে ‘সংক্ষেপিত’ কথাটি দিলে ভালো হয়। আগ্রহী পাঠক ‘নেট সংস্করণে’ পূর্ণাঙ্গ খবরটি পড়ে নিতে পারবে। বা অন্য কোনো উপায়ে ঢাকার সংস্করণ সংগ্রহ করে পড়ে নেবে। মনে রাখা দরকার, সব খবরের প্রতি সব পাঠকের সমান আগ্রহ থাকে না। পাঠকের একটা নিজস্ব খবর নির্বাচন পদ্ধতি থাকে।
অন্য কোনো উপায়ে যদি এই সমস্যার সমাধান করা যায়, তাও আগ্রহী পাঠকেরা প্রস্তাব করতে পারেন। এখন যেভাবে হচ্ছে, তা মেনে নেওয়া যায় না।
এর সঙ্গে আরও কয়েকটি সমস্যাও যুক্ত রয়েছে। যেমন: কোনো ‘খবর’ যদি কোনো মামলা-মোকদ্দমার প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে অপর পক্ষের উকিল বলবেন, ‘ওই দিনের ওই সংবাদপত্রে এ রকম কোনো খবরই প্রকাশিত হয়নি।’ একই তারিখের পত্রিকা যদি দুই রকম হয়, তাহলে এমন কথা তো উঠতেই পারে। এ ক্ষেত্রে মান্যবর বিচারক কোন ‘প্রমাণকে’ গ্রহণ করবেন?
সংবাদপত্র নিয়ে নানা গবেষণা হয়। গবেষণার উপকরণ হিসেবেও সংবাদপত্র ব্যবহূত হয়। একই তারিখের দুই রকম সংবাদপত্র প্রকাশিত হলে ভবিষ্যতে গবেষকদেরও নানা বিভ্রান্তিতে পড়তে হবে।
আমার নিজের ধারণা, আমাদের সংবাদপত্রে বাহুল্য কথা লেখার প্রবণতা বেশি। রাজনৈতিক সংবাদে এত নেতা, পাতিনেতার নাম ছাপানোর কোনো প্রয়োজন দেখি না। তাঁদের অনেকে মোটেও গুরুত্বপূর্ণ লোক নন। অথচ এ ধরনের লোকদের বক্তৃতা বা বিবৃতি সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিনই ছাপা হচ্ছে। হরতালের যে ঘণ্টাওয়ারি ও এলাকাভিত্তিক বিস্তারিত বিবরণ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়, তা খুব কম পাঠককেই আকর্ষণ করে। হরতালের খবরের জন্য সংবাদপত্রের এত মূল্যবান জায়গা ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়।
সংবাদপত্রের দুই সংস্করণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও খবর বাদ দেওয়া বা সংক্ষেপ করার একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রতিটি সংবাদপত্রের দায়িত্ব।
টক শো ও প্রযুক্তি
পাঠক জানেন, এখন বাংলাদেশে টিভি অনুষ্ঠানের মধ্যে ‘টক শো’ জনপ্রিয়। কত দিন এই জনপ্রিয়তা ধরে রাখা যাবে, তা বলতে পারি না। তবে এটুকু বলতে পারি, যারা টক শো পছন্দ করেন না, তাঁদেরও অনেকে নিয়মিত টক শো দেখেন। এটা একটা নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টক শো নিয়ে আরও ভাবনা-চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে, প্রযুক্তি ব্যবহার করে টক শোগুলো আরও বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ করতে পারা যায়। আনন্দের বিষয়, নতুন চালু হওয়া কয়েকটি টিভি চ্যানেল টক শোতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। এই প্রযুক্তি হলো: স্টুডিওর আলোচনার পাশাপাশি আরও নানা স্থান থেকে এমনকি অন্য জেলা থেকেও আলোচকেরা আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। এর ফলে নিঃসন্দেহে টিভি টক শোর গুরুত্ব অনেক গুণ বেড়ে গেছে। তবে প্রযুক্তির অভাবে সব টিভি চ্যানেল এখনো তা করতে পারেনি। দু-একটি চ্যানেল পেরেছে।
টিভির টক শোগুলো বড্ড বেশি ঢাকাকেন্দ্রিক। যেমন বিষয়বস্তুতে, তেমনি আলোচক নির্বাচনেও। হয়তো সময়স্বল্পতার কারণে সব সময় ঢাকার বাইরে থেকে আলোচক বা বিশেষজ্ঞ আমন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। তবে সপ্তাহে অন্তত এক-দুই দিন ঢাকার বাইরে থেকে আলোচক আমন্ত্রণ করলে ভালো হতো। তবে এ ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি একটা বড় সহায় হতে পারে। একই অনুষ্ঠানে ঢাকা ও অন্য জেলার আলোচকেরা নিজ নিজ শহরে বসেও আলোচনায় অংশ নিতে পারবেন।
আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোকে আরও একটি প্রযুক্তির কথাও ভাবতে হবে। যে প্রযুক্তি বাজারে রয়েছে। তা হলো: টক শোতে প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের স্কাইপের মাধ্যমে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা। পৃথিবীজুড়ে এটা করতে হবে, এমন নয়। তবে লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো—এ রকম কয়েকটি শহর দিয়ে এটা শুরু করা যায়। পরে অন্যান্য দেশে ও শহরেও সম্প্রসারণ করা যায়। এই প্রযুক্তিও বিরাট কিছু নয়। আশা করি, টিভি চ্যানেলগুলো ২০১২ সালে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে বৈচিত্র্যময় টক শোর সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেবে।
টক শো নিয়ে দর্শকদের অনেক সমালোচনার কথা শুনি। টিভি কর্তৃপক্ষের উচিত এসব সমালোচনা শোনা। সম্ভব হলে টক শোর দুর্বলতাগুলো দূর করা দরকার। টক শো নিজ গুণেই তার কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। এখন উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ও দর্শকদের সমালোচনা শুনে কিছু দুর্বলতা দূর করতে পারলে আমাদের টিভি টক শো আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হতে পারবে। সেটা কোনো অসম্ভব কাজ নয়।

Partner site : online news / celebrities /  celebrity image
website design by Web School.
Read more

সার্ক মিডিয়া দিবস ও আঞ্চলিক সম্মেলন

,
কয়েক সপ্তাহ আগে মালদ্বীপের আদ্দু শহরে ১৭তম সার্ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সার্ক সম্মেলনের রীতি অনুযায়ী, সম্মেলন শেষে সর্বসম্মতিতে একটি ‘ঘোষণা’ গৃহীত হয়। এবারের ‘আদ্দু ঘোষণা’র সর্বশেষ সিদ্ধান্ত ছিল: গণমাধ্যমবিষয়ক একটি আঞ্চলিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, যে সম্মেলনে বছরে একটি দিন ‘মিডিয়া দিবস’ হিসেবে পালন করার কর্মসূচি প্রণয়ন করা হবে।
খুবই প্রশংসাযোগ্য সিদ্ধান্ত। সার্ক দেশসমূহে মিডিয়ার সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের সবারই এই সিদ্ধান্তে খুশি হওয়ার কথা। এবারের সার্ক সম্মেলনে যাঁদের আগ্রহে ও সহযোগিতায় এ রকম একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, তাঁদের ধন্যবাদ জানাই।
সার্কের বয়স প্রায় ২৭ বছর হতে চলেছে অথচ মিডিয়ার মতো কার্যকর ও শক্তিশালী সেক্টর সম্পর্কে এ যাব ৎ তেমন কিছু হয়নি। অবশ্য না হওয়ার চেয়ে বিলম্বে হওয়াও ভালো। তাই এই প্রস্তাবিত আঞ্চলিক সম্মেলন কীভাবে গঠনমূলক ও কার্যকর করা যায়, সে ব্যাপারে আমরা কিছু পরামর্শ দিতে পারি।
প্রথমত দেখতে হবে, ‘সার্ক মিডিয়া ডে’ কীভাবে আয়োজন করা হবে, তা নির্ধারণ করাই হবে এই আঞ্চলিক সম্মেলনের একমাত্র এজেন্ডা। কাজেই ‘মিডিয়াবিষয়ক আঞ্চলিক সম্মেলন’ বলতে যা বোঝায়, এটা সে রকম কোনো সম্মেলন নয়। যে ধরনের সম্মেলনে বহু-বিষয়ক অধিবেশন হয়, বহু রকম প্রবন্ধ পাঠ হয়, এটা সে রকম কোনো সম্মেলন হবে না। এটা যেন উদ্যোক্তারা বিস্মৃত না হন।
বলাবাহুল্য, এ ধরনের সম্মেলনে শত শত ব্যক্তি অংশ নিতেও পারবে না। কারণ, এটা পলিসি নির্ধারণবিষয়ক সম্মেলন হবে। আশা করছি, এই আঞ্চলিক সম্মেলনে সার্ক দেশসমূহের নির্বাচিত সংবাদপত্রের সম্পাদক, টিভি ও রেডিও প্রতিষ্ঠানের প্রধান, বার্তা সংস্থার প্রধান, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের প্রধান, চলচ্চিত্রজগতের প্রতিনিধি, খ্যাতিমান কলামিস্ট, গণমাধ্যম গবেষক, গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ, তথ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা সচিব—এ ধরনের ব্যক্তিরাই আমন্ত্রিত হবেন। প্রতিবছর সার্কভুক্ত দেশে একটি ‘সার্ক মিডিয়া ডে’ উদ্যাপনের কর্মসূচির একটা কাঠামো যাঁরা রচনা করবেন। কাজটা খুব সহজ নয়। তবে যাঁদের কথা আমরা প্রস্তাব করছি, তাঁরা একটা সভায় বসলে ভালো কিছু বের করতে পারবেন, এমনটা আশা করা অনুচিত হবে না। তবে পদাধিকার বলে ছাড়া অন্য যাঁরা এই সম্মেলনে আমন্ত্রিত হবেন, তাঁরা যেন মৌলিক কিছু প্রস্তাব করার মতো মেধাসম্পন্ন হন, কর্তৃপক্ষকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। আমন্ত্রণের এই মনোনয়ন যেন দলীয় বিবেচনায় না হয়, সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। এ ধরনের ‘আঞ্চলিক সম্মেলন’ এক ধরনের পরোক্ষ প্রতিযোগিতাও। কোন দেশের প্রস্তাব বেশির ভাগ সদস্য দেশ গ্রহণ করছে বা কোন দেশের প্রতিনিধিরা গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, তার একটা প্রভাব আছে বৈকি।
আগেই বলেছি, এ ধরনের আঞ্চলিক সম্মেলনে কোনো দেশের শত শত প্রতিনিধি অংশ নিতে পারেন না। অথচ একটা দেশে মিডিয়ার প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তির সংখ্যা অনেক। মিডিয়ার প্রতিনিধিদের একটা বড় অংশ যাতে এই আঞ্চলিক সম্মেলনে তাঁদের মতামত তুলে ধরতে পারেন সে জন্য ‘আঞ্চলিক সম্মেলনের’ অন্তত এক মাস আগে সার্কের প্রতিটি দেশে একটি ‘পরামর্শ সভার’ আয়োজন করা যেতে পারে। প্রতিটি দেশের তথ্য মন্ত্রণালয় এর আয়োজক হবে। এ ধরনের সভায় শতাধিক প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো সম্ভব হয়। তবে শতাধিক প্রতিনিধিকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিলে তা খুব অর্থপূর্ণ সভা হবে কি না সন্দেহ। তবে প্রত্যেক আমন্ত্রিত ব্যক্তি যাতে ‘সার্ক মিডিয়া ডে’ বিষয়ে তাঁর আইডিয়া বা চিন্তা শেয়ার করতে পারেন, সে জন্য আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর দিনব্যাপী গ্রুপভিত্তিক আলোচনার আয়োজন করা যায়।
গ্রুপগুলো এ রকম হতে পারে: ১) মিডিয়া দিবসের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, ২) সংবাদপত্র ও বার্তা সংস্থার কর্মসূচি, ৩) টেলিভিশন, ৪) রেডিও, ৫) চলচ্চিত্র, ৬) সার্ক মিডিয়া ডের অনুষ্ঠান কাঠামো, ব্যাপ্তি ও অংশগ্রহণকারী ইত্যাদি। ‘মিডিয়া ডে’ উপলক্ষে প্রতিটি দেশে কী ধরনের কর্মসূচি নেওয়া যায় ও কেন্দ্রীয়ভাবে কী কর্মসূচি নেওয়া যায়, তা গ্রুপগুলো প্রস্তাব করতে পারে। দিনের শেষে প্লেনারিতে সব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার পর প্রস্তাবগুলো নির্দিষ্ট দেশের ‘প্রস্তাব’ হিসেবে সার্ক আঞ্চলিক সম্মেলনে পেশ করা যেতে পারে। সভায় আটটি দেশের প্রস্তাব নিয়ে আবার গ্রুপভিত্তিক আলোচনার পর চূড়ান্ত কর্মসূচি প্রণয়ন করা যেতে পারে।
আমরা মনে করি, এভাবেই ‘সার্ক মিডিয়া ডে’র কাঠামো ও কর্মসূচি চূড়ান্ত করলে তার ব্যাপক অংশীদারি নিশ্চিত হবে। আঞ্চলিক সম্মেলনে যেহেতু অনেকেই অংশ নিতে পারবেন না, সেহেতু আঞ্চলিক সম্মেলনের আগে একই এজেন্ডায় একটা পরামর্শ সভার আয়োজন করে অনেকের মতামত গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
এ রকম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘সার্ক মিডিয়া ডে’র কর্মসূচি প্রণয়ন করা প্রয়োজন এ জন্য যে একবার ভুল কাঠামোতে এই দিবস পালন শুরু হয়ে গেলে তা পরিবর্তন করা সহজ হয় না। ‘গতবার এ রকম হয়েছিল’—এ রকম অজুহাত দেখিয়ে অনেকেই ভুলভাবেই দিবসটি পালনের জন্য চাপ দিতে পারে। কাজেই দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য কী, কীভাবে তা কার্যকরভাবে পালন করা যায় তা খুব সুচিন্তিতভাবে প্রণয়ন করতে হবে। এই উপলক্ষে প্রস্তাবিত আঞ্চলিক সম্মেলনটি তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্মেলন যেন মিডিয়া প্রতিনিধিদের নিছক বিদেশ সফর হয়ে না দাঁড়ায় (বা অনেক সম্মেলনেই হয়ে থাকে) সেদিকে কর্তৃপক্ষের সজাগ দৃষ্টি রাখা দরকার। আঞ্চলিক সম্মেলনের আগে প্রতিটি দেশে একই এজেন্ডার ‘পরামর্শ সভা’ আয়োজন করা সে জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পরামর্শ সভা থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব আঞ্চলিক সম্মেলনে নেওয়ার একটা সুযোগ সৃষ্টি হবে।
‘সার্ক মিডিয়া ডে’র কর্মসূচি নির্ধারণের জন্য এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি আরও একটি বিশেষ কারণে প্রয়োজন। তা হলো সার্কের অন্যান্য সেক্টর একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। যেমন: কৃষি নিয়ে সার্ক কিছু কাজ করলে তা সার্ক আঞ্চলের সব মানুষ বিস্তারিত জানতে পারেন না। শুধু কৃষি সেক্টরে যাঁরা জড়িত, তাঁরাই জানতে পারেন। কিন্তু ‘মিডিয়া’ এমন একটি সেক্টর, যা সার্ক অঞ্চলের সব মানুষকে স্পর্শ করে। মানুষ কোনো না কোনো মিডিয়ার সংস্পর্শে আসেনই। মিডিয়া দ্বারা প্রভাবিত হন না বা অবহিত হন না, এমন ব্যক্তির সংখ্যা খুব কম। কাজেই সার্ক অঞ্চলের ‘মিডিয়া’ সার্ক অঞ্চলের মানুষদের উন্নয়নের জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করার একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এতে সার্ক অঞ্চলের সব মানুষকে তথ্য দেওয়া বা প্রভাবিত করা সম্ভব হবে। কাজেই ‘সার্ক মিডিয়া ডে’ অন্য ১০টি ‘দিবসের’ মতো গতানুগতিক, শুধু টি শার্ট পরে রাস্তায় হাঁটার মতো আনুষ্ঠানিকতায় সীমিত রাখার দিবস হবে না। এই দিবসের তা ৎ পর্য ও কার্যকারিতা অনেক বিরাট। যদি না আটটি দেশের মিডিয়া নেতারা ও তথ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টির বৈশিষ্ট্য, গুরুত্ব ও সম্ভাবনাটা উপলব্ধি করতে পারে।
আমাদের দেশে কোনো ‘দিবস’ পালন বড় ঘটনা নয়। (জাতীয় দিবস নয়) এসব দিবস কখন আসে, কখন যায়, অনেকে জানেও না। শুধু মন্ত্রণালয় ও সরকারি কয়েকটি অফিস ‘দিবসটির’ বরাদ্দকৃত বাজেট ব্যয় করে থাকে। এর বেশি গুরুত্ব কোনো দিবসই সৃষ্টি করতে পারেনি। ‘সার্ক মিডিয়া ডে’ যেন সে রকম কোনো ‘দিবস’ না হয়।
সার্ক অঞ্চলের সাংবাদিকদের নিয়ে অতীতে একটা ‘ফোরাম’ গঠিত হয়েছে। সেই ফোরামের উদ্যোগে নানা দেশে সেমিনারও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কিন্তু ফোরামটি ‘সেমিনার’ ছাড়া আর কী কাজ করেছে, তা আমার জানা নেই। অন্তত প্রচারিত হতে দেখিনি। সেই ফোরামের কাঠামো, সদস্য হওয়ার নিয়ম, কমিটি গঠন পদ্ধতি, সেমিনারের আউটপুট, সার্ক সম্মেলনে সেই ফোরামের ভূমিকাসহ নানা বিষয় সবাইকে জানানো প্রয়োজন। সার্ক দেশের সাংবাদিকদের এই ফোরামও অনেক কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। যদি তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য পরিষ্কার থাকে। আমাদের সন্দেহ হয়, এই ফোরাম নানা সংকীর্ণ কারণে তার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। মিডিয়াবিষয়ক সার্ক আঞ্চলিক সম্মেলন ও প্রস্তাবিত সার্ক মিডিয়া ডের কর্মসূচি প্রণয়নে এই ফোরামের অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগানো যায়।
আমরা গভীর প্রত্যাশা ও আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করব মিডিয়াবিষয়ক সার্কের আঞ্চলিক সম্মেলন ও প্রস্তাবিত ‘সার্ক মিডিয়া ডে’র প্রতি। এই আঞ্চলিক সম্মেলন যেন প্রস্তাবিত ‘সার্ক মিডিয়া ডে’র একটা গঠনমূলক, কার্যকর ও অর্থপূর্ণ কাঠামো ও কর্মসূচি প্রণয়ন করতে পারে। সার্ক দেশসমূহের উন্নয়নে এই অঞ্চলের মিডিয়া আলাদাভাবে ও সম্মিলিতভাবে অনেক বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। যদি সেই ‘নেতৃত্ব’ ও ভিশন’ সার্ক অঞ্চলের মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচন করতে পারে। শুধু রাজনীতি বা সরকারেই নয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান বা ফোরামেও নেতৃত্বের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।

Partner site : online news / celebrities /  celebrity image
website design by Web School.
Read more