Showing posts with label General. Show all posts
Showing posts with label General. Show all posts

দেশপ্রেম প্রমাণের উপায়

,
প্রেম জিনিসটা একেবারেই আপেক্ষিক। ভালোবাসতে জানতে হবে। না জানলে ভালোবাসা হবে না। প্রেমের নমুনা তো কতই আছে। শিরি-ফরহাদ, লাইলী-মজনুর গল্প যেমন আমাদের জানা, তেমনি আমরা জানি চণ্ডীদাস-রজকিনির গল্পও। প্রেমের এক-একটা উৎকৃষ্ট উদাহরণ। লিজেন্ডারি প্রেমিক এক-একজন। ইতিহাস ঘেঁটে দ্বিতীয়টি পাওয়া যাবে না। না, ভুল বলা হলো। পাওয়া যাবে। সেই যে রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড প্রেমের জন্য সিংহাসন ত্যাগ করেছিলেন। হালের প্রিন্স চার্লসই বা কম যাবেন কিসে? বুড়ো বয়সে প্রেমের উদাহরণযোগ্য রেকর্ড তো তিনিও গড়েছেন। এই প্রেমের সঙ্গে দেশপ্রেমের তুলনা করে লাভ নেই। দেশপ্রেম আর এমনি প্রেম এক জিনিস নয়। যে কেউ প্রেমে পড়তে পারে, প্রেমে পড়ার স্বাধীনতা সবার আছে। কিন্তু দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠা দেখানোর যোগ্যতা কয়জনের থাকে? ওটা অর্জন করতে হয়। হ্যাঁ, একাত্তরে বাঙালি দেখিয়ে দিয়েছিল দেশপ্রেম কাকে বলে। বাঙালির দেশপ্রেম আজও তাই উদাহরণ হয়ে আছে। কিন্তু আজকের দিনে কী অবস্থা? আজকের দিনে দেশপ্রেমিক কারা?
একটা বিষয় সবাই স্বীকার করবেন, সময় পাল্টেছে। একুশ শতক বলে কথা! আজকের দিনে তো আর সেই বিংশ শতাব্দীর ধ্যান-ধারণা নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। আগেকার দিনে প্রেম ভেসে বেড়াত বাতাসে। কেমন করে? গানেই তো আছে, 'এক পলকে একটু দেখা'।
সেই একটু দেখা থেকে অনুরাগের সৃষ্টি। আহা কী সব দিন! বারান্দায় হালকা হাওয়ায় একটুখানি আঁচল উড়ল কী প্রেমিকের হৃদয় পুড়ল। ঘরের জানালার পর্দা একটু নড়ল, প্রেমিকের মনের ভেতর ঝড়। এই বুঝি দেখা দিল! কী সে করুণ আর্তি, 'চাঁদ কেন ওঠে না আমার ঘরে।' ওদিকে আরেকজন মনে মনে বলছে, 'ইশারায় শিস দিয়ে আমাকে ডেকো না'। না, ইশারার দিন গেছে। চিঠি-চাপাটি এখন আর চলে না। কী সব ঝক্কি গেছে। চিঠি একটা লেখা হলো, কিন্তু সেটা কাঙ্ক্ষিতার হাতে কেমন করে পেঁৗছানো যাবে? মাধ্যম খুঁজতে হতো। মাধ্যম পাওয়াটাও কি চাট্টিখানি ব্যাপার? পাওয়া না গেল তো নিজের হাতের নিরিখ পরীক্ষার পালা। চিঠি দলা পাকিয়ে বাড়িতে ছুড়ে মারা। সে চিঠি অন্যের হাতে পড়লে আর রক্ষা নেই। এসব তো সেদিনের কথা। আজকের দিনে এমন কেউ ভাবতেই পারে না। মোবাইল ফোনে একটা-দুটো শব্দের এসএমএস পাঠালেই হয়ে গেল। ওদিকে রাতভর ফেসবুক তো আছেই। মোট কথা, প্রেমের পথে এখন তেমন কোনো বাধাই নেই। সবাই এখন যুগের তারে বাঁধা পড়েছে। কিন্তু এসএমএস, ফেসবুক দিয়ে তো আর দেশপ্রেমের পরীক্ষায় পাস করা সম্ভব নয়। জনসেবার ভেতর দিয়ে দেশপ্রেমের প্রমাণ রাখা সম্ভব। কিন্তু জনসেবার সুযোগ তো সবার আসে না। এটা অনেকটা পরীক্ষার মতো। দেশপ্রেমের পরীক্ষায় পাস করার একটা সহজ রাস্তা হচ্ছে রাজনীতি। এই পথ ধরে হাঁটতে হলে ধৈর্য থাকতে হয়। ধৈর্য ধরতে জানতে হয়। অধৈর্য হলে রাস্তা থেকে ছিটকে পড়ার আশঙ্কাটাই বেশি থাকে। অনেকটা গাছে চড়ার মতো। একটু একটু করে উঠতে হয়। আবুল মুনসুর আহমদের গল্পটা অনেকেরই জানা। সেই যে এক ভদ্রলোকের শখ হয়েছিল জনগণের সেবা করার। তিনি এলাকার মানুষকে সেই কথা বলে বেড়াতে শুরু করলেন। জনসেবার পথ খুঁজতে কিংবা জনসেবা করতে তিনি ভোটে দাঁড়িয়ে গেলেন। ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার। কিন্তু মেম্বারদের ক্ষমতা অনেক সীমিত। তিনি তাঁর ইচ্ছেমতো জনসেবা করতে পারেন না। নিজের এই দুঃখের কথা এলাকার মানুষকে জানাতেই এলাকার লোকজন তাঁকে চেয়ারম্যান বানিয়ে দিল। কিন্তু তার পরও তিনি ইচ্ছেমতো জনগণের সেবা করতে পারেন না। কেন? ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের ক্ষমতা আছে। কিন্তু সে ক্ষমতাও খুব বেশি নয়। কী হবে এবার? ভদ্রলোকের জনসেবার, দেশসেবার ইচ্ছে কি মরে যাবে? তাঁর এত দিনের শখ কি পূরণ হবে না! এবার ভদ্রলোককে তাঁর এলাকার লোকজন এমপি বানিয়ে দিল। ভদ্রলোক এমপি হয়ে সংসদে গেলেন। কিন্তু সেবা করতে পারেন না তিনি। দেশপ্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া তখনো বাকি। তিনি এলাকার লোকজনের কাছে সেই দুঃখের কথা বলেন। কেমন করে কেন্দ্রের মন্ত্রীরা সব নিয়ে যাচ্ছেন, তিনি দেশপ্রেমের পরীক্ষা দিতেই পারছেন না, সেই দুঃখের কথা শোনার পর এলাকায় বিক্ষোভ হলো। এবার তাঁকে মন্ত্রী বানাতে হবে। এলাকার মানুষের চাপে ভদ্রলোককে মন্ত্রী বানিয়ে দেওয়া হলো। এরপর কী হলো? ভদ্রলোক দেশপ্রেমে এতই মশগুল হয়ে গেলেন যে এলাকার মানুষকে আর দেখাই দিতে পারেন না! হতেও তো পারে। প্রেমের জন্য যদি অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়, দেশপ্রেমের জন্য তো আরো বেশি কিছু ত্যাগ করা প্রয়োজন। নিন্দুকদের ভাষায়, এটাই হচ্ছে রাজনীতি। এখানে একবার কেউ ওপরে উঠে গেলে নিচের কথা ভুলে যায়। নাকি পরিবেশটাই এমন যে ভুলে যেতে হয়? ভুলে যেতে বাধ্য করা হয়। দেশের জন্য যাঁদের ভাবনার অন্ত নেই, তাঁদের নিন্দুকের অভাব নেই। নিন্দুকদের কাজই হচ্ছে নিন্দা করা। ভালো কিছু নিন্দুকদের চোখেই পড়ে না। আধুনিক বিশ্বে রাজনীতিবিদদের চেয়ে বড় দেশপ্রেমিক নেই। কিন্তু রাজনীতি যাঁদের ধ্যান-জ্ঞান, তাঁদের নিয়ে সমালোচনার অন্ত নেই। কেউ ভাবেন না, দেশের জন্য কাজ করতে গেলে অন্য কিছু ভাবা যায় না। এমনকি জনগণকেও ভুলে যেতে হয়। দেশপ্রেম বলে কথা! অনেকে বলে থাকেন, ক্ষমতায় যাওয়ার আগে রাজনীতিবিদরা যেসব কথা বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সব কথা ভুলে যান। এসব নিয়ে সমালোচনা হয়। গল্প লেখা হয়। আজকের দিনের কথা না হয় বাদ দেওয়া গেল, সেই গোপাল ভাঁড়ের আমলেও এই কথা রাখা-না রাখা নিয়ে গল্প তৈরি হয়েছে। শোনা যাক।
গোপাল ভাঁড়ের এই গল্পটা আপনারা জানেন। রাজা বললেন, শীতের রাতে কেউ কি সারা রাত এই পুকুরে গলাপানিতে ডুবে থাকতে পারবে? যদি কেউ পারে, আমি তাকে অনেক টাকা-পয়সা-ধনরত্ন পুরস্কার দেব।
এক ছিল গরিব-দুঃখী মানুষ। সে বলল, আমি পারব।
সে মাঘ মাসের তীব্র শীতে সারা রাত পুকুরের পানিতে গলা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। ভোরে সে উঠল পানি থেকে। রাজার কাছে গিয়ে সে বলল, আমি সারা রাত পুকুরের পানিতে ছিলাম। আপনার সান্ত্রি-সেপাই সাক্ষী। এবার আমার পুরস্কার দিন।
রাজা বললেন, সেকি, তুমি কেমন করে এটা পারলে?
গরিব লোকটা বলল, আমি পানিতে সারা রাত দাঁড়িয়ে থাকলাম। দূরে, অনেক দূরে এক গৃহস্থবাড়িতে আলো জ্বলছিল। আমি সেদিকে তাকিয়ে থেকে সারা রাত কাটিয়ে দিলাম।
মন্ত্রী বলল, পাওয়া গেছে। এই যে দূরের প্রদীপের আলোর দিকে ও তাকিয়ে ছিল, ওই প্রদীপ থেকে তাপ এসে তার গায়ে লেগেছে। তাই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে এই শীতেও ওই পুকুরে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা।
রাজা বললেন, তাই তো! তাহলে তো তুমি আর পুরস্কার পাবে না। তাকে বিদায় করে দেওয়া হলো।
গরিব লোকটা কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিল। সে গেল গোপাল ভাঁড়ের কাছে। অনুযোগ জানাল তাঁর কাছে। সব শুনে গোপাল ভাঁড় বললেন, ঠিক আছে, তুমি ন্যায়বিচার পাবে।
গোপাল ভাঁড় দাওয়াত করলেন রাজাকে। দুপুরে খাওয়াবেন। রাজা এলেন গোপাল ভাঁড়ের বাড়িতে। গোপাল ভাঁড় বললেন, আসুন, আসুন। আর সামান্যই আছে রান্নার বাকি। কী রাঁধছি দেখবেন, চলুন।
গোপাল ভাঁড় রাজাকে নিয়ে গেলেন বাড়ির পেছনে। সেখানে একটা তালগাছের ওপর একটা হাঁড়ি বাঁধা আর নিচে একটা কুপিবাতি জ্বালানো।
গোপাল ভাঁড় বললেন, ওই যে হাঁড়ি, ওটাতে পানি, চাল, ডাল, নুন সব দেওয়া আছে। এই তো খিচুড়ি হয়ে এল বলে। শিগগিরই আপনাদের গরম গরম খিচুড়ি খাওয়াচ্ছি।
রাজা বললেন, তোমার বাড়িতে দাওয়াত খাব বলে সকাল থেকে তেমন কিছু খাইনি। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। এখন এই রসিকতা ভালো লাগে!
রসিকতা কেন, রান্না হয়ে এল বলে, বললেন গোপাল ভাঁড়।
রাজা বললেন, তোমার ওই খিচুড়ি জীবনেও হবে না, আমার আর খাওয়াও হবে না। চলো মন্ত্রী, ফিরে যাই।
গোপাল বললেন, মহারাজ, কেন খিচুড়ি হবে না। দূরে গৃহস্থবাড়িতে জ্বালানো প্রদীপের আলো যদি পুকুরের পানিতে ডুবে থাকা গরিব প্রজার গায়ে তাপ দিতে পারে, এই প্রদীপ তো হাঁড়ির অনেক কাছে। নিশ্চয়ই খিচুড়ি হবে।
রাজা ভুল বুঝতে পারলেন। এ ঘটনার পর সত্যি সত্যি গরিব লোকটাকে অনেক পুরস্কার দিয়েছিলেন।
কিন্তু এখন? না খুঁজলেও অনেক ভাঁড় পাওয়া যাবে এখন। কিন্তু কর্তার ইচ্ছায় কর্ম করেন তাঁরা।
যা হোক, দেশপ্রেম নিয়ে কথা হচ্ছিল, সেখানেই যাওয়া যাক। দেশপ্রেমের নমুনা কেমন হতে পারে? এক ভদ্রলোক রাজনীতিতে নেমেছেন। শুরু করেছেন ঘরোয়া রাজনীতি দিয়ে। অর্থাৎ মাঠের বক্তৃতা তখনো শুরু করেননি। ছোটখাটো হলরুম ভাড়া করে লোকজন ডেকে নিজের কথা বলেন। তো একদিন তাঁর মনে হলো, তিনি দেশপ্রেমের নমুনা দেখাবেন। যেমনি ভাবা, তেমনি কাজ। তিনি লোকজন ডেকে বক্তৃতা করতে গেলেন। কেমন সে বক্তৃতা? নমুনা দেওয়া যাক।
'ভাইসব, এই যে আমাকে দেখছেন, আমি পুরোপুরি দেশপ্রেমিক। আমি সব সময় দেশের পণ্য কিনে ধন্য। এই যে কোট পরেছি আমি, এটা দেশের কাপড় দিয়ে দেশের দর্জি তৈরি করেছে।' তিনি কোটটা খুলে ফেললেন। 'গায়ে যে জামাটা দেখছেন, এটাও দেশের কাপড়।' তিনি জামাটা খুলে ফেললেন। 'এই যে প্যান্টটা পরেছি, এটাও দেশের তৈরি।' তিনি প্যান্টটা খুলে ফেললেন। মঞ্চের সামনে এসে বললেন, 'এই যে আন্ডারওয়্যার দেখছেন, এটাও দেশের তৈরি।' দর্শকসারিতে সবাই হাসাহাসি করতে শুরু করলে ভদ্রলোক জামা-প্যান্ট পরে বাড়িতে ফিরে গেলেন।
বাড়িতে ফিরে স্ত্রীকে বললেন, আমি দেশপ্রেমের নমুনা দেখাতে গেলাম, সবাই হাসাহাসি করল কেন? স্ত্রী জানতে চাইলেন, কেমন করে তিনি নমুনা দেখাচ্ছিলেন। ভদ্রলোক বর্ণনা দিলেন। বললেন, যখনই আন্ডারওয়্যার দেখাতে গেছি, তখনই হাসাহাসি। ভদ্রলোকের স্ত্রী বললেন, তোমার তো একটাই আন্ডারওয়্যার। ময়লা হয়ে যাওয়াতে ওটা আজ ধুয়ে দেওয়া হয়েছে। তুমি আজ আন্ডারওয়্যার ছাড়াই প্যান্ট পরে গিয়েছিলে।
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ : মেকি দেশপ্রেম দেখাতে গিয়ে অরিজিনাল ভেতরটা দেখিয়ে দেবেন না।

Partner site : online news / celebrities /  celebrity image
website design by Web School.
Read more

কলোরাডো! রকি মাউনটেন হাই

,
সন্ধ্যাবেলা লেখার টেবিলে বসেছি। উদ্দেশ্য, একটা ভয়ংকর ভূতের গল্প লিখব। বাংলাদেশের ভূতের গল্পে নরম-সরম ব্যাপার থাকে। আমাদের ভূত-পেতনিরা মাঝেমধ্যে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে। রাতে গ্রামের কোনো বাড়িতে তরুণী বধূ ইলিশ মাছ ভাজছে। গন্ধে গন্ধে পেতনি উপস্থিত হবে। নাকি গলায় বলবে, ‘এঁকটা ভাঁজা মাঁছ দিঁবি?’
নিশিরাতে বাঁশগাছের ওপর বসে তারা গাছ ঝাঁকায়। খিক খিক করে হাসে। কেউ কেউ বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গৃহস্থের নাম ধরে ডাকে। এসব।
আমেরিকান ভূতেরা ভয়ংকর। সিরিয়াল কিলার টাইপ। তাদের মধ্যে মানবিক কোনো ব্যাপারই নেই। সবই ‘ভূতবিক’ ব্যাপার।
আমার চেষ্টা বাংলাদেশের পটভূমিকায় আমেরিকান ভূতের গল্প লেখা। কলজে কাঁপানো ভয়ংকর গল্প।
লিখতে বসে দেখি ভূতের গল্প আসছে না, গান আসছে। আমি ভাবলাম, গান অনেক দিন লেখা হয় না। একটা লেখা হোক। লেখা হলো।
শাওন পড়ে বলল, গান হয়নি, কবিতা হয়েছে।
আমি বললাম, কবিতাও হয়নি। ছন্দের ত্রুটি আছে। তবে দুর্বল এই কবিতায় সুর বসালেই ত্রুটি কাটবে।
শাওন বলল, সুর বসালেও এই গান যেন কখনো গীত না হয়। এই গানে শাওনের নাম এসেছে। কোনো পুরুষ-গায়ক হুমায়ূন আহমেদ সেজে আমার নাম নিয়ে গান করবে, তা হবে না।
আমি বললাম, ঠিক আছে। সুর বসুক। তোমাকে কথা দিলাম, এই গান গীত হবে না।
প্রয়াত সংগীতকার সত্য সাহা আমাকে বলেছিলেন, হুমায়ূন ভাই, আপনি একটা পত্রিকার পলিটিক্যাল সাব-এডিটরিয়াল আমাকে এনে দিন, আমি সুর করে দেব।
সত্য সাহা নেই। তাঁর পুত্র ইমন সাহা আছে। দেখি, সে কিছু করতে পারে কি না। আশা কম। পুত্র এখনো পিতাকে ছাড়িয়ে যায়নি।
ইমনের একটি গল্প বলার লোভ সামলাতে পারছি না। সে আমার ঘেঁটুপুত্র কমলা ছবির মিউজিক ডিরেক্টর। প্রায়ই তার স্টুডিওতে কাজ কত দূর হলো দেখতে যাই। সে দুনিয়ার মিষ্টি কিনে আনে, যদিও জানে, ডায়াবেটিস নামের ব্যাধির কারণে হতাশ চোখে মিষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমার কিছু করার নেই। সে সম্ভবত আমার হতাশ দৃষ্টিটাই দেখতে চায়। হাঃ হাঃ হাঃ।
যে রাতে কর্কট ব্যাধির চিকিৎসার জন্য ঢাকা থেকে রওনা হব, সেই রাতে সে আমাকে দেখতে এল। তার মুখে কোনো কথা নেই। সে এসেই আমার বাঁ হাত ধরে কচলাকচলি করতে লাগল। একপর্যায়ে আমি বললাম, ইমন, তোমার সমস্যা কী? তুমি তো আমাকে অচল করে দিচ্ছ।
ইমন লজ্জিত গলায় বলল, স্যার, দুই দিন আগে আমি আপনাকে নিয়ে একটা স্বপ্ন দেখেছি। এই জন্য এমন করছি। স্বপ্নটা বলব?
বলো।
আমি দেখেছি, আপনি ঘেঁটুপুত্র কমলার মিউজিক শুনতে এসেছেন। আপনার শরীরটা ভালো না বলে সোফায় শুয়ে আছেন। আপনার শরীরের খোঁজ নেওয়ার জন্য আমি আপনার কাছে গেলাম। গিয়েই চমকে উঠে দেখি আপনি না। আমার বাবা শুয়ে আছেন। আমি ছুটে গিয়ে বাবার হাত ধরলাম। অনেকক্ষণ ধরে থাকলাম, তারপর ঘুম ভেঙে গেল।
আমি বললাম, ইমন! তুমি তো ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেছ। তুমি তোমার মৃত বাবার হাত কচলে এখন আমার হাত কচলাচ্ছ। আমাকেও মৃত বানানোর চেষ্টা?
বেচারার মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গেল। সে আমার হাত ছেড়ে দিল। আমি বললাম, ঠাট্টা করছি। তুমি আমার দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছ। আমার ঠাট্টা-তামাশায় অভ্যস্ত হতে হবে। একটা কথা তোমাকে বলি, গানবাজনায় তোমার উন্নতিতে তোমার স্বর্গবাসী পিতা যেমন খুশি হবেন, আমিও ঠিক তেমনি খুশি হব। এখন আমার ডান হাতটা কচলাও। দুটি হাত ব্যালান্স হওয়া প্রয়োজন।
আচ্ছা, এখন দুর্বল কবিতা পড়া যাক। যাদের ভেতরে সুর আছে তারা দয়া করে সুর বসিয়ে পড়ুন।
ডেনভার থেকে হঠাৎ নিমন্ত্রণ
সেখানে নাকি উৎসব হবে
সারা রাত জেগে জ্যাজ সংগীত।
গিটারের ঝনঝন\
জ্যাজ আমার প্রিয় গীতি তা কি হয়?
মনে তাই জাগে কঠিন এক সংশয়
কোনো অজুহাতে ‘যাব না’ বলব কি?
বড় অভিমানী, ডেনভারবাসী শাওনের পূরবী দি।
তাঁর দুই চোখে সুরমা ও কুশিয়ারা
তুচ্ছ কারণে নামে দুই নদীধারা।
আমি বললাম, ‘যাব’।
পূরবী কারণে ডেনভারে ধরা খাব।
দুঃখ ও শোকে ক্লান্ত থাকবে মন
সারা রাত জেগে জ্যাজ সংগীত
গিটারের ঝনঝন।
উৎসব শেষ, আমিও শেষ প্রবল জ্বরে কাতর।
আমার কপালে হাত রেখে দেখি শাওন হয়েছে পাথর।
জ্বর কিছু নয়, তার চেয়ে ভয় ক্যানসার আছে পিছু।
আমি বললাম, শাওন, জানো কি?
রকি মাউনটেন হিমালয়েরও উঁচু।
শাওন বলল, তোমার মাথা এলোমেলো তাই বিশ্রাম প্রয়োজন।
ভুল হয়েছে উৎসবে আসা
গিটারের ঝনঝন।
আমি বললাম, এসো। বাজি রাখো। রকি মাউনটেন হাই
তার আশপাশে কোনো পর্বত নাই।
কে বলেছে জানো?
জন ডেনভার! মন দিয়ে শুধু শোনো।
মধুক্ষরা স্বরে তিনি গেয়েছেন,
‘রকি মাউনটেন হাই’
কাজেই তার চেয়ে উঁচু পর্বত
এই পৃথিবীতে নাই।
পরের দিনের কথা।
গায়ের জ্বর আরও বেড়েছে, নিঃশ্বাসে বড় কষ্ট।
শরীর ও মন অচল আমার
বিষয়টা হলো স্পষ্ট।
তাতে কী হয়েছে, শাওন তো আছে।
তাকে নিয়ে যাব রকি পর্বতে
শাওন গাইবে মধুমাখা স্বরে
রকি মাউনটেন হাই
কলোরাডো! রকি মাউনটেন হাই
ডেনভারে যাওয়ার আগেই এই গান লেখা। গান শুনে মনে হতে পারে, নিতান্ত অনিচ্ছায় শুধু পূরবীর মন রক্ষায় সেখানে গেছি। ‘ইহা সত্য নহে।’ আমি ডেনভার গেছি দুই পুত্রকে ডেনভার দেখাতে এবং শাওনকে রকি পর্বতমালা দেখাতে।
রকি পর্বতমালা নিয়ে আমার নস্টালজিয়া আছে। কী নস্টালজিয়া, তা ব্যাখ্যা করতে চাচ্ছি না।
পাদটীকা
পাঠকের যেমন মৃত্যু হয়, শ্রোতারও মৃত্যু হয়। অতি প্রিয় গান একসময় আর প্রিয় থাকে না। তবে কিছু গান আছে, কখনো তার আবেদন হারায় না। আমার কাছে মরমি কবি গিয়াসুদ্দিনের একটি গান সে রকম। ওল্ড ফুলস ক্লাবের প্রতিটি আসরে একসময় এই গান গীত হতো। শাওনের প্রবল আপত্তির কারণে এই গান এখন আর গীত হয় না। গানটির শুরুর পঙিক্ত—
মরিলে কান্দিস না আমার দায়
ও জাদুধন! মরিলে কান্দিস না আমার দায়।

Partner site : online news / celebrities /  celebrity image
website design by Web School.
Read more

পাহাড়ে এতো এনজিও টাকা যায় কোথায়?

,

Banana.jpg
পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের নামে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা কাজ করলেও পাহাড়ের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন এখনো আসেনি।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে দেশী-বিদেশী বিপুল এনজিও তাদের দাতাগোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছে। পাহাড়ের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। এ অঞ্চলের প্রতি রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও বিশেষ দৃষ্টি। পুর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানের মত একটি পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য তারা তৎপর। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে চলছে রমরমা মহাজনী ব্যবসা।একথা দিবা লোকের মত স্পষ্ট যে, দাতাগোষ্ঠী বা সাম্রাজ্যবাদী অক্ষশক্তি বিনা স্বার্থে এক পেনিও ব্যয় করে না। কালের কন্ঠের রাঙামাটি প্রতিনিধি ফজলে এলাহী প্রেরিত প্রতিবেদনে এর বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে:
“পার্বত্য চট্টগ্রামে কাজ করছে দেশি-বিদেশি অনেক উন্নয়ন সংস্থা। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তির পর এসব দাতা সংস্থা ও এনজিও পাহাড়ে নানা উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করে। সরকারের পাশাপাশি পার্বত্যবাসীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এসব সংস্থা কাজ করলেও এখানকার সিংহভাগ জনগোষ্ঠী এখনো চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। গত দেড় দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বেসরকারি খাতে কত টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে সেই সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোন তথ্যও নেই কারো কাছে।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের একটি পর্যালোচনা রিপোর্টে দেখা যায়, রাঙামাটিতে ৪৩ স্থানীয়, ১৮ জাতীয় এবং ৬টি আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) কাজ করছে। এদের মধ্যে ২০১০-১১ অর্থবছরে ৩৬টি এনজিওর ৪৯ কোটি ১২ লক্ষ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে খরচ হয়েছে ৩৬ কোটি ৮৮ লক্ষ। সব এনজিও মোট উপকারভোগী দেখিয়েছে ৭ লক্ষ ৬৬ হাজার ৮৬০ জন। এক্ষেত্রে একই ব্যক্তি সুবিধাভোগী হিসেবে একাধিক এনজিওর তালিকায় রয়েছেন। এমন অনেক এলাকা বা গ্রাম এখনো আছে যেখানে এনজিওদের ক্ষুদ্র্ঋণ ছাড়া আর কোন কার্যক্রম পৌঁছেনি।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসক সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী এনজিও ও দাতা সংস্থার কাজে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। সম্প্রতি জেলা প্রশাসন সম্মেলন কক্ষে এনজিও সমন্বয় সভায় তিনি বলেন, 'এনজিওগুলোর কাজে অস্বচ্ছতা, গরমিল ও অস্পষ্টতা লক্ষ্যণীয়। আবার তারা সরকারের সাথে সমন্বয় করে কাজ করার ব্যাপারেও
অনাগ্রহী। আশা করছি, এনজিওগুলোও তাদের স্বার্থেই আমাদের সহযোগিতা করবে।' এনজিও সংস্থার কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট নয় পাহাড়ের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষও।পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন রাঙামাটি জেলা কমিটির সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর কামাল বলেন, 'এসব সংস্থা যদি সকল জাতিগোষ্ঠীর জন্য সমানভাবে কাজ করত তবে পাহাড়ের চেহারাই পাল্টে যেতো। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তারা নিরপেক্ষভাবে কাজ
করছে না। তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে পাহাড়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে।'
এ বক্তব্যের দ্বিমত পোষণ করে এনজিওসমূহের নেটওয়ার্ক সিএইচটিওন-এর সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব চাকমা বলেন, 'এনজিওরা কাজ করছে বলেই এখানকার মানুষ কিছুটা হলেও সচেতন হচ্ছে, আলোচনা, সমালোচনা করতে পারছে।'
ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) রাঙামাটি জেলা সংগঠক অলকেষ চাকমা বলেন, 'গত ৮ বছরে পাহাড়ে ইউএনডিপির অর্জন একেবারেই শূন্য। সরকার একসময় উন্নয়ন বোর্ড, জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে যেভাবে একশ্রেণীর লুটেরা তৈরি করেছিল তেমনি পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর ইউএনডিপির মাধ্যমে আরেকটি লুটেরা সুবিধাভোগী শ্রেণী তৈরি করছে। ইউএনডিপি পাহাড়ি সমাজে বিভক্তি তৈরি করছে, শ্রেণী বৈষম্য বাড়াচ্ছে।'
এনজিও কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, 'কিছু এনজিও কিছু ভালো প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে কিন্তু সামগ্রিকভাবে আশাবাদী হওয়ার মতো কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। এনজিওরা পাড়া বা গ্রামপ্রধানদের সাথে সমন্বয় করে না। এমনকি নিজেদের মধ্যেও সমন্বয় আছে বলে মনে হয় না।' রাঙামাটি সদর উপজেলার সাপছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রমোদ চাকমা বলেন, 'ইউএনডিপির কার্যক্রম আমরা যেভাবে চেয়েছি সেভাবে হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন আসেনি, প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয় এবং পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।'
স্থানীয় সাংবাদিক জাগরণ চাকমা বলেন, 'ইউএনডিপির বিভিন্ন প্রকল্পে পাহাড়ে বিশেষ কিছু পরিবার এবং তাদের স্বজনরা ছাড়া সাধারণ মানুষ উপকৃত হয়নি। গত আট বছরে তাদের সফলতার কোন চিত্র দৃশ্যমান নয়। তাদের কারণে পাহাড়ে শ্রেণী বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।”
সূত্র : কালের কন্ঠ, ২৭.১০.২০১১

Partner site : online news / celebritiescelebrity image
website design by Web School.
Read more

সৌদি আরবে শিরশ্ছেদ : অভিবাসন প্রক্রিয়ায় আরো সতর্ক দৃষ্টি প্রয়োজন

,
প্রবাসে কাজ করতে গিয়ে বা অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার পথে বাংলাদেশি শ্রমিকদের নানাভাবে মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে আমরা আগাগোড়াই পরিচিত। কখনো সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে সলিল সমাধি, কখনো অবৈধ পথে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সময় গাড়ি উল্টে, কখনো দিনের পর দিন না খেয়ে পাহাড়ে, জঙ্গলে অথবা গুহায় লুকিয়ে অনেক তরুণের মৃত্যুর ঘটনা অসংখ্যবার আমাদের দৃষ্টিসীমায় এসেছে। তবে সব কিছুই যেন ছাপিয়ে গেছে সম্প্রতি সৌদি আরবে হত্যার অভিযোগে আট বাংলাদেশি তরুণের শিরশ্ছেদের ঘটনা। এ ঘটনার পর দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত তরুণদের পরিবার ও দেশের মানুষ শোকাহত হয়েছে। পত্রিকা পড়ে এবং টেলিভিশনে সংবাদ দেখে সাধারণ মানুষ বিস্মিত হয়েছে। কেননা এভাবে কারো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচলন আমাদের দেশসহ উন্নত কোনো দেশেই নেই। অনেকের কাছেই তাই মনে হয়েছে, এই সভ্যতা আর জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগে এ ধরনের নির্মম মৃত্যুদণ্ড কতটা যুক্তিসংগত। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও এই মৃত্যুদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কিন্তু এও ঠিক যে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ প্রচলিত বা স্বীকৃত বিচারব্যবস্থার ওপর অন্য কারো হস্তক্ষেপের সুযোগ কম। আরব দেশগুলোতে এই সুযোগ আরো সীমিত।
৭ অক্টোবর শুক্রবার সৌদি আরবে প্রকাশ্যে আট বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর তাদের প্রচলিত আইন অনুযায়ী লাশ সে দেশেই দাফন করা হয়। মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত সবাই ২০০৭ সালের এপ্রিলে সৌদি আরবের রিয়াদে নির্মাণাধীন বিন লাদেন কম্পানির একটি গুদামে ডাকাতি, অস্ত্র লুট এবং ওই গুদামের মিসরীয় নিরাপত্তারক্ষী হুসেইন সাইদ মোহাম্মেদ আবদুল খালেককে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় সৌদি আরবের আইন অনুসারে অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়। কট্টর ইসলামী দেশ সৌদি আরবে এ ধরনের মৃত্যুদণ্ড সাধারণত প্রকাশ্যেই কার্যকর হয়।
বলা হয়েছে, শিরচ্ছেদ হওয়া আট বাংলাদেশিকে বাঁচানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ছিল সরকার এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। জানা যায়, ২০০৭ সালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত স্বজনের সবাই জনশক্তি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর (বিএমইটি) সহযোগিতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সৌদি সরকারের কাছে অভিযুক্তদের প্রাণভিক্ষার আবেদন করেছিলেন। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে এই মৃত্যুদণ্ডাদেশ মওকুফের জন্য প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা সব রকম প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে বলে প্রকাশ। সবশেষে রাষ্ট্রপতি অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ মওকুফে সৌদি সরকার বরাবর আবেদন জানান। কিন্তু নিহত মিসরীয় হুসেইন সাইদ মোহাম্মেদ আবদুল খালেকের পরিবার ক্ষমা প্রদর্শন না করায় অভিযুক্ত বাংলাদেশি কর্মীদের প্রাণরক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এই আট তরুণকে বাঁচাতে সৌদি সরকারও চেষ্টা করেছিল বলে দাবি করা হয়েছে। ঘটনার দুদিন পর ঢাকায় সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ড. আব্দুল্লাহ আল বুসাইরি সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, 'মিসরীয়র প্রাণের বিনিময়ে রক্তমূল্য (ব্লাড মানি) দিতে সৌদি সরকারও দেন-দরবার করে। আট বাংলাদেশিকে সৌদি আরবে তাদের অনুমোদিত নিজস্ব বিচার ধারায় শিরশ্ছেদ নিয়ে আমাদের আপত্তি-অভিযোগ থাকলেও স্বীকার করতেই হবে, এটি সে দেশের প্রচলিত নীতিরই অংশ। যুগ যুগ ধরে সে দেশে এভাবেই নিজ দেশ বা অন্য কোনো দেশের অভিযুক্তদের শিরশ্ছেদের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
বাংলাদেশের যে ৭৫ লাখ মাইগ্র্যান্ট শ্রমিক বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে কাজ করছে, এর মধ্যে সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিক সবচেয়ে বেশি। দক্ষ, অদক্ষ সব পেশার শ্রমিকই সৌদি আরবে কাজ করে। প্রতিবছর যে ফরেন রেমিট্যান্স আমরা পাই, তার সিংহভাগও আসে সৌদি আরব থেকে। অনেকেরই হয়তো জানা আছে, বেশ কয়েক বছর ধরে সৌদি আরব আমাদের দেশ থেকে নানা কারণে শ্রমিক আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে বিগত সরকার ও বর্তমান সরকার বহু দেন-দরবার করেও এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের দরজা আগের মতো উন্মুক্ত করতে পারেনি। সৌদি আরব ও অন্যান্য দেশ বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক নিতে অলিখিতভাবে অনীহা প্রকাশ করেছে। তবে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে এক শ্রেণীর শ্রমিকের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হওয়ার ঘটনায় শুধু যে শ্রমিকরাই দায়ী, তা নয়। কথিত শ্রমিক রপ্তানিকারক থেকে শুরু করে দালাল, ফড়িয়া এবং দূতাবাসগুলোতে কর্মরত যাঁরা রয়েছেন, তাঁরাও এ জন্য কমবেশি অভিযুক্ত। তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়ী এক শ্রেণীর কথিত দালাল, যারা বেশি মুনাফার লোভে অতিরিক্ত অভিবাসন ফি নিয়ে অদক্ষ শ্রমিকদের সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রেরণ করে থাকে। ফলে এভাবে মাইগ্র্যান্ট শ্রমিকরা তাদের ব্যয়িত অর্থ তুলতে নানাবিধ অসাধু ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে এমনও দেখা যায়, চার-পাঁচ বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করার পরও একজন শ্রমিক ব্যয়িত অর্থ তুলতে পারেনি। শুধু বুকভরা বঞ্চনা, দুঃখ-কষ্ট আর ক্ষোভ নিয়ে খালি হাতে দেশে ফিরে এসেছে। বলতে দ্বিধা নেই, আজ তারই ভয়ংকর খেসারত আমাদের দিতে হচ্ছে।
সৌদি আরবের ঘটনায় আট বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকারের ব্যর্থতা ও প্রবাসে বাংলাদেশিদের আইনগত সহায়তার ব্যাপারে সরকারের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। পররাষ্ট্রসচিব, বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিভাগের পরিচালক, রিয়াদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং ওই দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলরকে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
সৌদি আরবে যে ঘটনা ঘটল, এর জন্য অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপটসহ নানা অনুষঙ্গ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে সরকারের প্রতি অনুরোধ, যে আট তরুণের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে তাদের পরিবারের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে যেন আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়। সবশেষে বলব, পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা নিজেদের বদলাতে পারছি না। আর তাই বিদেশের মাটিতে কলঙ্ক, অপবাদ আমাদের মোটেও পিছু ছাড়ছে না। আট তরুণের শিরশ্ছেদ হওয়ার ঘটনায় অবশ্যই আমরা মর্মাহত, শোকাহত। আমাদের সবারই তাই চিন্তায়-উপলব্ধিতে পরিবর্তন আনতে হবে। অবশ্যই অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় কমাতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিক রপ্তানিতে দক্ষতা, একাগ্রতা এবং বিশ্বস্ততার জায়গায় আমাদের গভীর দৃষ্টি দিতে হবে। এ থেকে দ্রুত উত্তরণ ঘটাতে না পারলে আমাদের শ্রমবাজারে আরো অশনি সংকেত অত্যাসন্ন।

Partner site : online news / celebritiescelebrity image
website design by Web School.
Read more

সৌদি বিচারের অমানবিকতা

,
সৌদি আরব আট বাংলাদেশিকে গত শুক্রবার (৭ অক্টোবর) জনসমক্ষে শিরশ্ছেদ করে তাদের অমানবিকতার নজির রাখল। এই অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যদি আমেরিকার নাগরিক হতো, তাহলে সৌদি আরব এ সাহস করত কি না সন্দেহ। বলা বাহুল্য, সৌদি আরবের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কটা অসমভিত্তিক। এই মুসলিম দেশটি খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ আমেরিকার কাছে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে পদানত। ইরাক-আমেরিকার দ্বিতীয় দফা যুদ্ধ চলাকালে একটি মার্কিন সাময়িকীতে দেখেছিলাম, সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেলকূপগুলো পাহারা দিচ্ছে কয়েক হাজার মার্কিন সেনা। সমরাস্ত্রসজ্জিত তারা। ইন্টারনেট ঘেঁটে ক্রিস্টোফার প্রেবল নামের একজন সাংবাদিকের এশিয়া টাইমস-এ (এপ্রিল ২৫, ২০০৩) প্রকাশিত ‘ট্রুপস ইন সৌদি অ্যারাবিয়া আর সুপারফ্লুয়াস অ্যান্ড ডেঞ্জারাস’ (সৌদি আরবে মার্কিন সেনা নিয়োগ অপ্রয়োজনীয় ও বিপজ্জনক) প্রবন্ধে দেখলাম, তিনি তর্ক করছেন যে ইরাক-আমেরিকা যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি মুলুকে মার্কিন সেনা নিয়োজিত রাখার দরকার কী? সৌদি আরবে মার্কিন সেনা নিয়োজিত হয় ১৯৯০ সাল থেকে, যখন ইরাকের সাদ্দাম হোসেন মেজাজ চড়া করে এক রাতেই কুয়েত দখল করে ফেলেন।
কিন্তু প্রেবলের মতে, সৌদি আরবে মার্কিন সেনা নিয়োজিত থাকার কারণে দুটি ক্ষতি হয়ে গেছে। এক হচ্ছে, মার্কিনদের আয়করের টাকা সৌদি আরবে খরচ করা হচ্ছে; আর দ্বিতীয় হচ্ছে, ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদা সংগঠনের জন্য সদস্য সংগ্রহের সময় এটাই ছিল মারাত্মক যুক্তি-অস্ত্র যে মুসলমানদের পবিত্র ভূমি সৌদি আরবে মার্কিন সেনা নিয়োগের অর্থ হচ্ছে, আমেরিকার কাছে ইসলামের পদানত হওয়া।
কাজেই সৌদি আরবের এ ড্র্যাকোনিয়ান আইন বা প্রাচীন ইহুদি আইন, ‘অ্যান আই ফর অ্যান আই’, চোখের বদলে চোখ এবং ‘আ টুথ ফর আ টুথ’, দাঁতের বদলে দাঁত যদি সমতার ভিত্তিতে সব দেশের অপরাধীর ওপর কার্যকর হতো, আমাদের আপত্তি ছিল না। কিন্তু রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, এ বছর যে ৫৮ জন লোককে শিরশ্ছেদ করা হয়েছে, তার মধ্যে ২০ জন অপরাধী হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে আসা শ্রমিক। এর ফলে সৌদি আরবের শিরশ্ছেদ-সংস্কৃতি বস্তুত ‘শক্তের ভক্ত নরমের যম’ প্রবণতাকে স্বীকার করে।
আমরা এখানে যে আটজন বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ হয়েছে, তাদের পক্ষে সাফাই গাইছি না, কারণ, যে দেশে তারা অপরাধ করেছে, সে দেশের আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তি হয়েছে। কিন্তু আইন কার্যকর করার পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশ্নটি উঠবেই। বিশ্বব্যাপী অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বহু দিন ধরে সৌদি আরবের আইনকানুন ও বিচারকাজ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয় বলে শোর তুলছে।
এই আটজন বাংলাদেশিকে শিরশ্ছেদ করার আইনটি এসেছে, আগেই বলেছি, ওল্ড টেস্টামেন্টের ‘অ্যান আই ফর অ্যান আই’ আইন থেকে। হত্যার বদলে হত্যা। আক্ষরিক অর্থে, চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত যেমন, হত্যার বদলে হত্যা তেমন। এই আটজন বাংলাদেশির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা কথিত বৈদ্যুতিক তারের দোকান থেকে তার ও বৈদ্যুতিকসামগ্রী ডাকাতি করার সময় সাইদ মোহাম্মদ আবদুল খালেক নামের এক মিসরীয় নিরাপত্তা প্রহরীকে খুন করে। কাজেই হত্যার বদলে হত্যার আইনটি তাদের ওপর জারি হয়। সৌদি রীতি অনুযায়ী, এই আইনের কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে একমাত্র নিহত ব্যক্তির পরিবারবর্গ, তারা যদি হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেয়। এ প্রসঙ্গে কাজী কাদের নেওয়াজের ‘প্রতিশোধ’ কবিতার কথা বলা যেতে পারে, যেখানে কবি আরব্য আতিথেয়তার ওপর চমৎকার একটি আলেখ্যকে কবিতায় বয়ান করেছেন: ‘পুত্র, তোমার হত্যাকারীরে পাইনিকো আজও ঢুঁড়ে/ আফসোস তাই জ্বলিছে সদায় তামাম কলিজাজুড়ে’ ইত্যাদি। বাবা ছেলের হত্যাকারীকে ঘরে আশ্রয় দিয়েছিলেন না জেনে। জানার পর অতিথিকে রাত পোহালে বললেন, ‘আমি জেনেছি, তুমি আমার পুত্রের হত্যাকারী। কিন্তু তুমি আমার অতিথি ছিলে বলে ছেড়ে দিলাম। সামনে কোনো দিন আবার দেখা হলে ঠিকই প্রতিশোধ নিয়ে নেব।’
সৌদি আরবের শিরশ্ছেদ আইনে এই অতিথিপরায়ণতার কোনো জায়গা নেই। সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসকে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মিসরের প্রান্তিক অঞ্চলের যে জায়গা থেকে সাইদের আগমন, সেখানকার লোকজন নাকি ব্লাড মানি বা রক্তের বদলে অর্থ গ্রহণ করে না। মিসরের ওই অঞ্চলের লোকদের রক্তনীতি না হয় অটুট থাকতে পারে, কিন্তু সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় আইনে এ ধরনের রক্তনীতি অনুসৃত হবে, এটা কেমন কথা!
রেনেসাঁ যুগে ইউরোপে প্রতিহিংসানির্ভর আইন ইংল্যান্ডসহ কোনো কোনো দেশে রদ হলেও আদালতের বাইরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিহিংসাজনিত হত্যা বংশপরম্পরায় চলতে থাকে। এমনকি ইংল্যান্ডের এলিজাবেথীয় নাট্যসাহিত্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে জিঘাংসা বা প্রতিহিংসার ওপর রচিত থিম। সাহিত্যে এ বিষয়ের ওপর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকলেও সমাজে এর আইনগত স্বীকৃতি ছিল না। তাঁর ‘প্রতিহিংসা’ নামের রচনায়, ইংল্যান্ডের তৎকালীন প্রথম সারির চিন্তাবিদ স্যার ফ্রান্সিস বেকন লিখেলেন, ‘রিভেঞ্জ ইজ আ ওয়াইল্ড জাস্টিস’। বেকনের সমসাময়িক শেক্সপিয়ার তাঁর নাটক মেজার ফর মেজার-এ খানিকটা চটুলভাবে দেখালেন, কেন চোখের বদলা চোখ আধুনিক মানবসমাজে গৃহীত হতে পারে না।
চোখের বদলা চোখ যদি সভ্য সমাজে গৃহীত হতে না পারে, তাহলে হত্যার বদলা হত্যাও তো গৃহীত হতে পারে না। কিন্তু সংকটটা সেখানেই হচ্ছে, যখন দেখছি যে একটি অমানবিক আইন পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত একটি দেশের শাসনতন্ত্রে সিদ্ধ আইন হিসেবে সন্নিবেশিত হয়ে আছে। যেমন, আমাদের দেশে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘এনকাউন্টার’-এ বিনা বিচারে মানুষ মারার একটা রেওয়াজ তৈরি হয়েছে। আমরা জানি, এটা একটা অসাংবিধানিক পন্থা। যদিও এটা কমবেশি চলছে, কিন্তু এটার সমালোচনায় আমরা কখনো থেমে থাকি না। কিন্তু এখন যদি আমাদের শাসনতন্ত্রে ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টারকে সিদ্ধ আইন হিসেবে সন্নিবেশ করা হয়, তাহলে আমরা বর্বর ও অসভ্য রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হব।
আরেকটি প্রাসঙ্গিক কথা এসে যায়। এই যে আটজন বাংলাদেশি ডাকাতি করতে গেল, কিন্তু কেন গেল? নিজের দেশে বাংলাদেশিরা ডাকাতি করতে পারে, কারণ তাদের এ দেশের শিথিল আইন সম্পর্কে জানা আছে। কিন্তু তারা তো ২০০৭ সালে ঘটনাটি ঘটার আগে থেকেই কাজের জন্য সৌদি আরবে ছিল। কেউ কেউ ২০০৩ থেকে, আর কেউ কেউ ২০০৪ থেকে সৌদি আরবে অবস্থান করছিল। তারা তো সৌদি আরবের আইনের কড়াকড়ি সম্পর্কে অবহিত ছিল যে চুরি করে ধরা পড়লে হাত কাটা যায়, আর খুন করলে মাথা কাটা যায়। এটা জেনেও তারা এই দুঃসাহসিক কাজটি করতে গেল কেন? নিশ্চয় পেটের দায়ে। পত্রপত্রিকায় প্রায় বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে পড়ি। বিশেষ করে সৌদি আরবে চাকরির মালিকদের হঠাৎ করে বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাকরি থেকে খসিয়ে দেওয়ার অনেক কাহিনি শুনেছি এবং পড়েছি। সৌদি আরবে চাকরিচ্যুত বা কর্মচ্যুত শ্রমিকদের নিদারুণ খাদ্যকষ্টে পড়তে হয়। সে ক্ষুধা নিবারণের জন্য তারা বৈধ পথ বন্ধ হয়ে গেলে অবৈধ পথে অর্থ উপার্জনের উপায় খোঁজে। এ জন্যই কি এই আটজন বাংলাদেশি ওই ভয়ংকর ডাকাতির পথে গিয়েছিল?
আমরা জানি না, সৌদি আদালতের বিচারে কী ধরনের যুক্তির আদান-প্রদান হয়েছিল, কিন্তু এ প্রশ্ন যদি সৌদি রাষ্ট্রের তরফ থেকে ওঠানো না হয়ে থাকে যে এদের চাকরিদাতা সৌদি মালিকেরা যখন এদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করল, তখন খোঁজ করা হলো না কেন যে চাকরি থেকে বিতাড়নের কারণ কী ছিল। আর এরা যখন বুভুক্ষু অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিল, তখন রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব বা নৈতিক দায়িত্ব কি ছিল না এদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করার? বিদেশি গরিব দেশের মানুষ চাকরি করতে এসে পেটের ক্ষিধায় মারা যাবে, কিন্তু যারা এর জন্য দায়ী, তাদের কোনো শাস্তি হবে না, অথচ এরা চুরি করলেই চরম শাস্তি পাবে—এ ধরনের ব্যবস্থা আর যা-ই হোক, কোনো সভ্য সমাজের পরিচায়ক নয়।

Partner site : online news / celebritiescelebrity image
website design by Web School.
Read more

মক্কা রয়েল ক্লক টাওয়ার : পৃথিবীর অন্যতম নান্দনিক স্থাপনা

,

dormo_makka-roye.jpg
পবিত্র কা’বা ঘরের দক্ষিণ প্রবেশপথসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত মক্কা রয়েল টাওয়ার (আবরাজ আল বায়েত) পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপনা। ৭৬ তলাবিশিষ্ট ১,৯৭২ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন এ টাওয়ারের একেবারে শীর্ষে গড়ে তোলা হয়েছে ১৩০ ফুট রাজকীয় ঘড়ি যা ১৭ কি.মি. দূর থেকে সময় গণনা করা যায়। চন্দ্র পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, মুসলিম ঐতিহ্য সংরক্ষণে জাদুঘর এবং হজ ও ওমরাহ পালনকারী পুণ্যার্থীদের জন্য ৩ হাজার অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত কক্ষ এ টাওয়ারের বৈশিষ্ট্য।
সৌদি আরবের খ্যাতনামা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বিন লাদেন গ্রুপ ২০০৪ সালে এ টাওয়ারের নির্মাণ কাজ শুরু করে। ২০১১ সালে এর নির্মাণ শেষ হবে বলে আশা করা যায় এবং সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০১২ সালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। ফ্লোরের সর্বমোট স্পেস হচ্ছে ১৬,১৫০,০০০ বর্গফুট, যা আরব আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ৩ নম্বর টার্মিনালের সমান।
৮০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মীয়মাণ এ টাওয়ারে ১০ হাজার মানুষ নামাজ আদায় করতে সক্ষম এমন বিশাল প্রার্থনা হল রয়েছে। টাওয়ারের সেভেন স্টার হোটেল প্রতি বছর পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালন উপলক্ষে মক্কা নগরী পরিভ্রমণকারী ৫০ লাখ পুণ্যার্থীর আবাসন সুবিধা প্রদান করবে। আবরাজ আল বায়েত টাওয়ারে প্রথম চার তলা শপিংমল এবং নিচে রয়েছে ১০০০ গাড়ি পার্কিংয়ের সুবিধা। টাওয়ারের একেবারে উপর তলায় দুটি হেলিকপ্টার অবতরণের জন্য রয়েছে প্রশস্ত হেলিপ্যাড।
১ লাখ মানুষের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এ টাওয়ারের শীর্ষে চারদিক দিয়ে দেখা যায় এমন একটি ঘড়ি স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি দিকের পরিমাপ হচ্ছে ১৪১১৪১ ফুট। জার্মানির প্রিমিয়ার কম্পোজিট টেকনোলজিস নামক কোম্পানি এর ডিজাইন তৈরি করে। লন্ডনের ওয়েস্ট মিনিস্টার ও ইস্তাম্বুলের কেভাহির মল টাওয়ার ঘড়ির চেয়ে মক্কা টাওয়ার ঘড়ির আয়তন ও নান্দনিকতা বেশি।
ঘড়ির চারপাশ আলোকিত করার জন্য ২০ লাখ LED (Light Emitting diode) বাতি, বিপুলসংখ্যক আল্লাহু আকবর লিখিত ক্যালিওগ্রাফি সংযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ২১ হাজার সাদা ও সবুজ বাতি ঘড়ির উপরাংশে স্থাপন করা হয়েছে, যাতে ৫ ওয়াক্ত নামাজের সময় ফ্ল্যাশ সংকেত দিতে পারে। আকাশের দিকের ১০ কি.মি. পর্যন্ত আলোক রশ্মি প্রক্ষেপণের জন্য ১৬ ধরনের ভার্টিক্যাল বাতি রয়েছে। ঘড়ির চারপাশের সম্মুখ অংশে ১০০ কোটি খণ্ড গ্লাস মোজাইক বসানো হয়েছে। ঘড়ির উপরে রয়েছে ৯৩ মিটার দৈর্ঘ্য অগ্রচূড়া এবং স্বর্ণালি মোজাইক ও ফাইবার গ্লাসের তৈরি ৩৫ টন ওজনের নতুন চাঁদ।
টাওয়ারের নিচ থেকে উপরে বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বহু লাউড স্পিকার স্থাপন করা হয়েছে যা ৭ কি.মি. দূর পর্যন্ত আজান ও নামাজের ধ্বনি প্রচার করতে পারে। রাতের বেলা ২১ হাজার বাতি ৩০ কি.মি. এলাকাকে আলোকোজ্জ্বল করে তুলবে। শ্বেত ও সবুজ বাতির বিশেষ আলো প্রক্ষেপণ দেখে বধির হাজীরা নামাজের সময় নির্ণয় করতে সক্ষম হবেন। মক্কা টাওয়ারে ঘড়ি স্থাপনের পেছনে আরও অনেক কারণ ক্রিয়াশীল। ১২৬ বছরের পুরনো গ্রিনিচমান (GMT) সময় পরিবর্তন করে মক্কার সময় চালু করা যাবে বলে অনেকের ধারণা। ২০০৮ সালে কাতারের রাজধানী দোহাতে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে মুসলিম বিজ্ঞানীরা মত প্রকাশ করেন যে, পৃথিবীর মধ্যম রেখা পবিত্র মক্কার উপর দিয়ে প্রলম্বিত, ফলে মক্কা পৃথিবীর টাইম জোনের কেন্দ্রবিন্দু। এছাড়া মক্কা আন্তর্জাতিক ধর্মীয় ও বাণিজ্য নগরী। ১৮৮৪ সালে পশ্চিমা বিশ্ব গ্রিনিচমান সময় চাপিয়ে দেয়।

Partner site : online news / celebritiescelebrity image
website design by Web School.
Read more

হাসানুজ্জামানের জন্য রাষ্ট্রের কি কোনো দায়িত্ব নেই?

,
আমাদের অনেক হতাশা আছে, আছে না পাওয়ার অনেক ইতিবৃত্ত। সব শ্রেণী-পেশার মানুষই গড়পড়তা ‘নেই নেই কিছু নেই’ রব তুলতে দ্বিধা করে না। কিন্তু এই না পাওয়া ও না থাকার ভেতরেই আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, পৃথিবীতে আমরাই সেই জাতি, যারা স্বাধীনতার ৪০ বছরে খাদ্যশস্যের উ ৎ পাদন তিন গুণ বৃদ্ধি করতে সমর্থ হয়েছি। স্বাধীনতার সময় আমাদের জনসংখ্যা ছিল সাত কোটি; এখন তা দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু এর মধ্যেও আমাদের অর্জন অনেক বেশি। আমরা নিজেদের উ ৎ পাদন দিয়েই পুরো জনগোষ্ঠীর খাদ্যচাহিদার প্রায় সবটুকু মেটাতে পারছি। কিছু না হোক, প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি মানুষ ভাত খেয়ে বেঁচে থাকছি। এর চেয়ে গর্বের কিছু নেই। একাত্তরে আমাদের চালের উ ৎ পাদন ছিল মাত্র এক কোটি টন, এখন তিন কোটি টনের ওপরে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, চালের উ ৎ পাদন কমবেশি তিন কোটি ১৪ লাখ মেট্রিক টন। কথা হচ্ছে, আমাদের মতো জনবহুল ও অল্প জমির দেশে প্রধান খাদ্যশস্য ধান-চাল আবাদের এই প্রাচুর্য এমনি এমনি সৃষ্টি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানের হাত; মানে বিজ্ঞানীদের নিবিড় মনোযোগ ও গবেষণা-সাফল্য। একই জমিতে বেশি ধান উ ৎ পাদনে বিজ্ঞানীদের নিরন্তর ও সফল গবেষণা। আর এ ক্ষেত্রে যত বিজ্ঞানীর অবদান, ত্যাগ, নিষ্ঠা ও অক্লান্ত শ্রম রয়েছে, তার মধ্যে ড. শাহ্ মো. হাসানুজ্জামানের নাম অগ্রগণ্য।

ষাটের দশকে যখন বিশ্বব্যাপী মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা নড়েচড়ে বসছেন, তখন আমাদের আজকের এই বাংলাদেশও ছিল সংকটাপন্ন দেশের সারিতে। তখন যে কয়জন তরুণ বিজ্ঞানী দেশের মানুষের খাদ্যের নিশ্চয়তা দেওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন, তাঁদের অন্যতম ড. শাহ্ মো. হাসানুজ্জামান। অনেকেরই জানা নেই, কী বিশাল অবদান তাঁর এ দেশের ধান গবেষণায়! তিনি ১৯৬৯ সাল থেকে রাইস স্পেশালিস্টে ইকোনমিক বোটানিক হিসেবে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সময় তিনি নিযুক্ত হন সহকারী পরিচালক হিসেবে। ১৯৭৮ সালে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের প্রথম মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৮৪ সালে অবসর গ্রহণ পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বেই বহাল থেকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটকে নিয়ে গেছেন কৃতিত্বপূর্ণ অবস্থানে। বাংলাদেশের প্রথম রাইস ব্রিডার হিসেবে ধান গবেষণায় তাঁর নেতৃত্বেই আসে যুগান্তকারী সাফল্য। এ দেশের মানুষ স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত উচ্চফলনশীল জাতের যে ধানগুলোর আবাদ শুরু করে, তার সবই হাসানুজ্জামানের উদ্ভাবিত। তাঁর সময়ে তাঁর নিজের হাতে ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে উদ্ভাবিত হয়েছে এ দেশের উচ্চফলনশীল প্রায় ২৪টি জাত। সেই জাতগুলোই আমাদের ধানের ফলন বৃদ্ধির প্রধান বুনিয়াদ। সেই ধানগুলোই আজও জনপ্রিয় দেশের মানুষের কাছে, সম্প্রসারকদের কাছে; বিজ্ঞানীদের কাছে তো বটেই। তারপর যত জাতের গবেষণা হয়েছে, সব তারই ধারাবাহিকতা। বলা যায়, অধ্যাপক হাসানুজ্জামান আমাদের ধান গবেষণার প্রধান নায়ক। প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি মানুষের ভাত খেয়ে বেঁচে থাকার এক নিয়ামক শক্তি। তাঁর পথ ধরে এ দেশে অনেক বিজ্ঞানী তৈরি হয়েছেন, দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন শত শত বিজ্ঞানী।

৮৬ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত নানা রোগ নিয়ে তিনি আজ শয্যাশায়ী। তাঁর এক শুভাকাঙ্ক্ষী মারফত খবর পেলাম, হাসপাতালে চিকি ৎ সা করার মতো আর্থিক সংগতিও তাঁর পরিবারের নেই। সারা জীবন দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া মানুষটির পাশেও নেই তেমন কেউ। বন্ধুস্থানীয় বর্ষীয়ান বিজ্ঞানীরা তাঁর এই শেষ বয়সের অপ্রত্যাশিত পরিণতি দেখে মর্মাহত। খোঁজখবর জানার জন্য সেদিন কথা বলেছিলাম ড. কাজী বদরুদ্দোজার সঙ্গে। হাসানুজ্জামানের সমসাময়িক কৃষিবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি বলেন, দেশের জন্য নিরন্তর কাজ করে যাওয়া বিজ্ঞানীদের শেষ জীবনের এই অসহায়ত্ব খুবই অপ্রত্যাশিত। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কোনোভাবেই তার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না।

Partner site : online news / celebritiescelebrity image
website design by Web School.
Read more

তবুও পালিয়ে বেড়াই

,

সঙ্গত কারণেই আমি মেয়েটির নাম উল্লেখ করছি না। উচ্ছল এক তরুণী। আমাদের স্থানীয় সহকর্মী। বয়স একুশ-বাইশ বছর। টিপিক্যাল আইভরিয়ানদের চেয়ে ও খানিকটা খাটো, গায়ের রংও ততটা কালো নয়। সিঁড়িতে দেখা হলো, আমি যখন ক্যাফেটারিয়ায় যাচ্ছি এক কাপ ধূমায়িত কফির সন্ধানে। ওর মুখে সকালের ঝলমলে রোদ। মাথার শত বিনুনি দুলিয়ে বলল, ব্লাড ডোনেট করতে যাচ্ছি।
‘স্বেচ্ছাসেবক হোন, রক্ত দিন, জীবন বাঁচান’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে আইভরিকোস্টের ইউনাইটেড নেশনস ভলান্টিয়ার (ইউএনভি) প্রোগ্রাম আয়োজন করেছে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির মতো একটি মহত্ এবং অতি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। আজ ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৬। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে এই কর্মসূচি।
কর্মসূচিটিকে প্রয়োজনীয় বলছি এজন্য যে, মিশনের প্রকিউরমেন্ট কমিটির একজন মেম্বার হওয়ার সুবাদে আমি জানি এই দেশে কর্মরত জাতিসংঘের দেশি-বিদেশি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের জীবন বাঁচাতে রক্তের কত প্রয়োজন। দু’সপ্তাহ আগে প্রকিউরমেন্ট কমিটির এক মিটিংয়ে আমাদের চিফ মেডিকেল অফিসার ডাক্তার মইসকে দেখেছি এক প্রাণান্তকর যুক্তিযুদ্ধে নেমেছেন কমিটিকে কনভিন্স করতে, কেন রক্ত কেনার ব্যাপারে সম্পূর্ণ প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়াটি মানা সম্ভব হয়নি। তোতাপাখির শেখানো বুলির মতো আমাদের বিজ্ঞ সদস্যরা কেবল মন্তব্য করে যাচ্ছেন—পুরো নিয়ম মানা হয়নি, কাজেই এটা পাস করা যাবে না। একমাত্র আমিই বলেছিলাম, রক্ত কেনার ব্যাপারে কিছুটা ছাড় দেয়া যেতে পারে। আমি সব সময় একটা কথা বিশ্বাস করি—মানুষের জন্য আইন, আইনের জন্য মানুষ নয়। আমি জানি আমার এই মন্তব্য কোট করা হবে এবং এজন্য আমি বিপদেও পড়তে পারি। মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য যদি বিপদে পড়তে হয়, সেই বিপদে আমি স্বাচ্ছন্দেই পড়তে চাই।
সকালের রোদটা এসি রুমের ভার্টিকেল ব্লাইন্ডের ফাঁক দিয়ে এসে গালের ওপর আছড়ে পড়ে, তখন আমার কাছে আলো-ছায়ার এই খেলাটি বড় অদ্ভুত লাগে। ক্যাফেটারিয়ার বিশাল জায়েন্ট সাইজের কাচের উইন্ডোগুলোতে লাগানো ভার্টিকেল ব্লাইন্ডগুলো এজন্যই আমার খুব পছন্দ। এসপ্রেসোর ছোট্ট সাদা কাপটি হাতে নিয়ে যখন দ্বিধার দোলায় দুলছিলাম, রক্ত দিতে যাব কি যাব না, তখন ক্যাফেটারিয়ায় এসে ঢুকলেন প্যাট্রেসিয়া ভিকা, ইউএনভি প্রোগ্রাম ম্যানেজার। মরিশাসের এই মহিলা তেমন ভালো ইংরেজি বলে না; কিন্তু ওর মনটি দ্বীপদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সমুদ্রের হাওয়ার মতোই খোলা। দেখা হলেই ইংরেজি-ফ্রেঞ্চ মিলিয়ে এক অদ্ভুত ভাষায় অভিবাদন জানাবে, কুশল জিজ্ঞেস করবে। আজ ওর কণ্ঠে কিছুটা অভিমান। কী ব্যাপার, তুমি যে এখনও এলে না? সুই দেখলেই যে আমার মূর্ছা যাওয়ার মতো অবস্থা হয় একথা আমি ওকে কীভাবে বোঝাই?
আজ আমার গাড়ি নেই। কাজেই লাঞ্চেও যাওয়া হয়নি। বিকালে একটু আগেভাগেই বেরিয়ে পড়লাম। দেখি কাউকে পাওয়া যায় কি-না লিফটের জন্য। বরাবরের মতো সামনের গেট দিয়ে না বেরিয়ে সেব্রোকোর পেছনের গেট দিয়ে, যেখানে একটা মস্ত বড় পাহাড়ি শিমুল ছাতা মেলে দাঁড়িয়ে আছে, ওখান দিয়ে বেরুলাম। শিমুলতলায় কি কেউ কাঁদছে? দুই হাঁটুর নিচে মাথা গুঁজে কে যেন বসে আছে। আমার কি এগিয়ে যাওয়া উচিত? আমি এগিয়ে যাই। ওমা! এ তো সেই মেয়ে, সকালে যে উদ্ভাসিত হাসিতে ঝলমলে রোদ খেলিয়ে রক্ত দিতে গেল। আমি ওর নাম ধরে ডাকলাম। ও মাথা তুলল, ঘাড় ঘোরাল। তাকাল আমার দিকে। মেয়েটির দু’চোখ ঝাপসা। সেই ঝাপসা চোখে ও কি আমাকে চিনতে পারছে? বললাম, চিনতে পারছ? আমি কাজী। ও তখন প্রায় শব্দ করে কাঁদতে শুরু করল। ও, ও কি আমার মতো সুই দেখে ভয় পেয়ে গেল নাকি? কিন্তু সে তো কোন্ সকালের কথা। জিজ্ঞেস করলাম, রক্ত দিয়ে ভয় পেলে নাকি? মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। বলল, আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে? ওকে খুব অসহায় লাগছে। এরকম পরিস্থিতিতে কাউকে ‘না’ বলা একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু আমি নিজেই আজ খোঁড়া মানুষ, গাড়ি নেই। ওকে পৌঁছে দিই কী করে? বললাম, চলো।
একটা রেড ট্যাক্সি নিলাম। এই শহরে দুই ধরনের ট্যাক্সি আছে। লাল আর হলুদ। হলুদ ট্যাক্সিগুলো বাসের মতো। একজন একজন করে যাত্রী তোলে, তারপর সবাইকে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেয়। লাল ট্যাক্সিগুলো প্রাইভেট, রিজার্ভ খেপ মারে। লাল ট্যাক্সিতে বসে মেয়েটি বলল, ওরা আমার রক্ত নেয়নি। আমি বললাম, কেন হিমোগ্লোবিন কম? এতে মন খারাপের কী আছে। তুমি বেশি করে কলিজা খাবে। হিমোগ্লোবিন বেড়ে যাবে। মেয়েদের রক্তে হিমোগ্লোবিন একটু কমই থাকে। ও বলল, না আমার রক্তে এইচআইভি আছে। আমি আঁেক উঠলাম। তবে আমার চমকানোটা ওকে বুঝতে দিলাম না। একটা শুকনো হাসি দিয়ে বললাম, এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এইচআইভি বহন করলেই মানুষ মরে যায় না। তোমার তো আর এইডস হয়নি? ও কোনো কথা বলছে না। বুঝলাম, আমার এই যুক্তিতে ও তেমন খুশি হয়নি।
যে দেশের ছেচল্লিশ শতাংশ মানুষের রক্তে এইচআইভি, সে দেশে এটা কি খুব অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা? ব্লাড স্ক্রিনিং করতে গিয়ে এমন দু’চারটা কেস যে পাওয়া যাবে এটা তো প্রায় অবধারিত। ওকে নামিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভাবছি, জীবনের সব অবধারিত ঘটনা মেনে নেয়া যায় না। যেমন মৃত্যু।আমার কেবলই মনে হচ্ছে এই রক্তদান কর্মসূচিটি না আয়োজন করলেই ভালো হতো।

Partner site : online news / celebritiescelebrity image
website design by Web School.
interior design
Read more